কওমি স্বীকৃতি ও মিডিয়ার বিমাতাসুলভ আচরণ

This post has already been read 964 times!

জহির উদ্দিন বাবর
Media-গত এক সপ্তাহ ধরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কওমি মাদরাসার সরকারি স্বীকৃতির ঘোষণা। গণভবনে দেশের শীর্ষ আলেমদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘোষণা দেন। এরপর থেকে স্বীকৃতির প্রসঙ্গটি আলোচিত হচ্ছে সবখানে। যারা স্বীকৃতি পাচ্ছেন কিংবা এর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত তারা এতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন; কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্তে সরকারি দলের বেশির ভাগ লোক সন্তুষ্ট হলেও কেউ কেউ অসন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন এমন অনেকেই এর বিরোধিতা করছেন। আবার আলেম-ওলামার মিত্র হিসেবে পরিচিত বিএনপি পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে ভেতরে ভেতরে অনেক হতাশ হয়েছে। ইসলাম নামধারী একটি রাজনৈতিক দল এই স্বীকৃতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ওই দলটির নেতাকর্মীরা তাদের কদর্য চেহারার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিগত কয়েক দিনে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত বিষয় কওমি মাদরাসার সরকারি স্বীকৃতি ইস্যু।

রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তির অবস্থান ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে বস্তুনিষ্ঠতা যার প্রধান বুলি সেই মিডিয়ার ভূমিকা খুবই হতাশাজনক। এই ইস্যুতে দেশের গণমাধ্যমগুলো কওমি মাদরাসাগুলোর প্রতি রীতিমতো বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। শেখ হাসিনার এই সাহসী সিদ্ধান্তকে যেখানে স্বাগত জানানো দরকার ছিল সেখানে মিডিয়া নানাভাবে কওমি মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো যেন কোনোভাবেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছে না। এই সিদ্ধান্তে তাদের যেন বড়ধরনের কোনো ক্ষতি হয়ে গেল। অথচ মিডিয়ার ভূমিকা কখনও এটা হওয়া কাম্য নয়। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলাই মিডিয়ার কাজ। অধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলা মিডিয়ার ধর্ম। অথচ কওমি স্বীকৃতি ইস্যুতে মিডিয়ার আচরণ সম্পূর্ণ বিপরীত।

বছরের পর বছর ধরে একটি শ্রেণিকে অধিকারহারা করে রাখা হয়েছে, লাখ লাখ মাদরাসাপড়–য়াকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। এখন যখন তাদের সামনে সামান্য প্রাপ্তির ঝিলিক দেখা দিয়েছে তখন এটা নিয়ে শুরু হয়েছে হৈচৈ। তারাও শিক্ষিত এই স্বীকৃতিটুকু কওমিপড়–য়ারা পেয়ে গেলে মিডিয়ার এমন কী ক্ষতি হয়ে যাবে! সামান্য কাজির পদ আর সরকারি মসজিদে ইমামতি ছাড়া এই স্বীকৃতি দিয়ে তো কওমিপড়–য়ারা তেমন কিছুই করতে পারবেন না। তাদের সান্ত¦নার জায়গাটি হলো তারাও শিক্ষিত রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই বিষয়টির স্বীকৃতি লাভ। এটা মানসিক তৃপ্তির একটা বিষয়। এখানে কারও ক্ষতির কোনো আশঙ্কা তো দেখছি না।

বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের দেশের মিডিয়াগুলোর ভূমিকা বরাবরই হতাশাজনক। একচোখা নীতি লালন, ইসলামবৈরিতা পোষণ আর আলেম-ওলামার বিরোধিতা মিডিয়ার নতুন কোনো এজেন্ডা নয়। এগুলো মিডিয়ার কাটতি বাড়ায়। দেশের কয়েক হাজার কওমি মাদরাসা মূলধারায় চলে এলে মিডিয়ার কাটতিতে যথেষ্ট ঘাটতি পড়বে। তারা আর তখন ইচ্ছেমতো রঙ লাগিয়ে মাদরাসা সম্পর্কে নেতিবাচক খবর পরিবেশন করতে পারবে না। মূলত এই কারণেই গণমাধ্যমগুলো কওমি স্বীকৃতির বিরুদ্ধে এই অবস্থান নিয়েছে। এতদিন অন্ধকারে ঢিল মেরে কওমি মাদরাসাকে ঘায়েল করা গেছে। সরকারি স্বীকৃতির আওতায় এসে গেলে সেই সুযোগ কমে যাবে বলেই কোনো কোনো মিডিয়ার এতো গাত্রদাহ।

বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী দেশের প্রভাবশালী একটি দৈনিক কওমি মাদরাসার এই স্বীকৃতিকে ‘রাজনীতিতে অশনিসংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছে। পত্রিকাটি লাল কালি দিয়ে বড় করে এই শিরোনাম করেছে। তাদের খবরটি পড়লে মনে হবে জাতির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে, তারা জাতিকে সতর্ক করছে। কওমি স্বীকৃতি নিয়ে বেশির ভাগ পত্রিকার অবস্থান হতাশাজনক। কোনো কোনো পত্রিকা তাদের ভাড়া করা কলামিস্টদের দিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে কওমিবিরোধী লেখা লেখিয়েছে। বাম-ডান সব পত্রিকা যেন এক হয়ে এর বিরুদ্ধে লেখেছে। মজার ব্যাপার হলো, এই ইস্যুতে অতি বাম আর অতি ডান সবাই এক হয়ে গেছে। মাদরাসা ও আলেম-ওলামা বিদ্বেষী তাদের চরিত্র এখানে একসঙ্গে ফুটে উঠেছে।

কওমি স্বীকৃতি নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই টেলিভিশনগুলোতে টকশো হচ্ছে। কথিত বুদ্ধিজীবীরা হাত-পা নাড়িয়ে অনেক বোঝার ভান করে যেভাবে কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে কথা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে এই শ্রেণিটা সবসময় অবদমিত হয়ে থাকবে এটাই তারা চান। যারা কওমি মাদরাসায় পড়ে তারাও যে এদেশেরই সন্তান, তারাও যে দেশের সম্পদ, তারাও যে আমাদেরই কারও না কারও সন্তান-ভাই সে কথাটি তারা ভুলে যাচ্ছেন। দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী এতদিন কেন স্বীকৃতিহীন রইল সেটা কেউ তালাশ না করে কেন তাদেরকে স্বীকৃতি দেয়া হলো এটা নিয়েই চলছে বিশ্লেষণ।

Sikriti_zahirbaborকলাম ও টকশোতে কথিত বুদ্ধিজীবীরা কওমি মাদরাসা সম্পর্কে এমন এমন আজগুবি তথ্য দিচ্ছেন যাতে সত্যের লেশও নেই। তারা মূলত শোনা কথার ভাঙা ক্যাসেট বাজিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কেউ কোনোদিন কওমি মাদরাসার বারান্দায়ও যাননি। আগে থেকেই তারা কওমি মাদরাসা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করে একটি অবস্থান নিয়ে আছেন। অথচ আমার বিশ্বাস, তারাও স্বচ্ছ অন্তর নিয়ে কওমি মাদরাসাগুলো পরিদর্শন করলে, এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিলে, কওমিপড়–য়াদের সঙ্গে মিশলে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। মূলত মাদরাসাগুলোর সঙ্গে তাদের একটা দূরত্ব আগে থেকেই সৃষ্টি হয়ে আছে। এই সন্ধিক্ষণে এসে তারা সেই দূরত্বের আলোকেই কথা বলছেন। মাদরাসাগুলো যে অনেকটা ইতোমধ্যে পাল্টে গেছে, সরকারি স্বীকৃতি কার্যকর হওয়ার পর যে মাদরাসায় আরও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে সেটা তাদের ভাবনায় নেই।

যারা কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি নিয়ে বিষোদগার করছেন তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, আপনি একটিবারের জন্য হলেও মাদরাসায় যান, নিজ চোখে দেখে এর সম্পর্কে মূল্যায়ন করুন। অদৃশ্য ইঙ্গিতে শেখানো বুলি আওড়িয়ে এই শিক্ষাধারার লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না। প্রায় এক কোটি লোক কওমি মাদরাসাগুলোর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। তাদেরকে বাদ দিয়ে আপনি সামগ্রিক উন্নতি অগ্রগতির কথা চিন্তা করতে পারেন না। তাই মিডিয়ার যেখানেই আপনি যুক্ত থাকুন, একটু হৃদয়ের কোমলতা দিয়ে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টা করুন। আশা করি এতে ভুল ভাঙবে আপনার, আমার।

দেশের অপরাপর শিক্ষাব্যবস্থার মতোই একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থা কওমি মাদরাসা। এখানে গোপনীয় কিছু নেই, সবই জাতির সামনে। এমনকি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা আলিয়া মাদরাসার চেয়ে কওমি মাদরাসার সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক অনেক বেশি। কারণ কওমি মাদরাসাগুলো সরাসরি জনগণের সহযোগিতায় চলে। একজন যে দল-মতেরই হোক স্থানীয় কওমি মাদরাসাটির সঙ্গে তিনি কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। এই দেশ ও মাটির অনেক গভীরে প্রোতিত কওমির শিকড়। আপনি বা আমি চাইলেই এই শিকড় উপড়ে ফেলতে পারবো না। এজন্য এর শিকড়কে আরও মজবুত করে কিভাবে দেশ ও জাতির কল্যাণের কাজে লাগানো যায় সেটা ভাবাই বেশি উপযোগী।

Related posts

*

*

Top