কালো গিলাফ ও সবুজ গম্বুজের ছায়ায়

mk8

This post has already been read 3786 times!

Imageমুসলমান হিসেবে প্রত্যেকের জীবনে একটি স্বপ্ন থাকে কালো গিলাফ ও সবুজ গম্বুজের দেশ মক্কা-মদীনা সফরের। আর সেটা যদি হয় ইসলামের অন্যতম রোকন হজের উদ্দেশে তাহলে তো কথাই নেই। সহজাত এই স্বপ্নটা আমারও ছিল সেই বুঝমান হওয়ার পর থেকেই। তবে এই স্বপ্নটা যে এত দ্রুত পূর্ণতা পাবে সেটা ভাবিনি কখনও। কিন্তু স্রষ্টার দরবারে মঞ্জুরি হয়ে গেলে অনেক অভাবনীয় বিষয়ও বাস্তবে রূপ নেয়। আমার হজে যাওয়ার বিষয়টিও অকস্মাৎ স্বপ্নের বাস্তবায়ন বলা যায়। কয়েক মাস আগেও জানতাম না আল্লাহর ঘর ও নবীর রওজা থেকে এতো দ্রুত ডাক চলে আসবে। আল্লাহর শোকর, তিনি একটি উসিলায় আমাকে পুণ্যভূমি জিয়ারত ও হজব্রত পালনের তাওফীক দিয়েছেন। নিজেকে সৌভাগ্যবান হিসেবেই মনে করি। মাকে নিয়ে হজ করতে যাওয়াটা অবশ্যই সৌভাগ্যের।

যেদিন থেকে শুনেছি ১০১১ সালের ২৫ লাখ সৌভাগ্যবান মুসলমানের মধ্যে আমিও একজন সেদিন থেকে মনের অবস্থা কেমন ছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে কলম অক্ষম। প্রতিটি মুহূর্ত কী যে আবেশে কেটেছে তা বলতে পারার মতো না। প্রেমিকের সঙ্গে প্রেমাস্পদের মিলনকে তুলনা করলে এখানে কম হবে। স্রষ্টা ও গোলামের এই মিলন দুনিয়ার সব সম্পর্কের ঊর্ধ্বে, সব সংজ্ঞার বাইরে। দুনিয়ার কোনো আবেগ, অনুভূতি ও উপমায় তা ফুটে তোলা সম্ভব না।

হজের প্রতিটি মুহূর্তই অপূর্ব আবেশে স্নিগ্ধ। দেশের মাটি পেরোনোর আগেই কাফনের কাপড়সদৃশ ইহরাম গায়ে জড়ানোর সময় যে অবস্থাটা হয় তা দুনিয়ার আর কোনো অবস্থার সঙ্গে তুলনীয় নয়। ‘লাব্বাইক’ বলে ইহরাম গায়ে জড়ানোর পর থেকে প্রতিটি মুহূর্ত নিজেকে মৃতের মতোই অনুভব হতে থাকে। হেজাজের জমিনে পা রাখার পর অন্যরকম যে অনুভূতির সৃষ্টি হয় সেটা বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সবাই অনুধাবন করতে পারবেন, বলে-কয়ে কাউকে বুঝানো সম্ভব নয়। কালো গিলাফে ঢাকা কাবার ওপর প্রথম দৃষ্টির অনুভূতিটিও বর্ণনাতীত। অমীয় সুধামিশ্রিত যমযমের পানির তরতাজা স্বাদটাও ভোলার নয়। দুনিয়ার কোনো পানীয়ের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। পানির মধ্যে যে এতো স্বাদ তা আর কোনো পানি পানে অনুভব করা সম্ভব না। লাখো মানুষের ¯্রােতে মাতাফে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়ার অবস্থাটাও স্মরণযোগ্য। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল লাখো মানুষের ¯্রােতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন অনেক বান্দা। হজের প্রধান আহকাম মিনা, আরাফা, মুযদালিফায় অবস্থান, শয়তানকে কংকর মারা, কুরবানী সবই নিজের মধ্যে ভিন্ন আবহের সৃষ্টি করে। আর প্রিয়নবীর প্রিয় শহর মদীনাতুল মুনাওয়ারার অসম্ভব সুন্দর প্রতিটি জিনিসই তো আজীবন স্মরণ রাখার মতো। পৃথিবীর সব শহরের সেরা সে শহর। এ শহরের প্রতিটি ধূলিকণা গীত গায় আল্লাহ-রাসূলের শানে। রওজায়ে পাকের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করার মুহূর্তটির চেয়ে উপভোগ্য ও অনুভবযোগ্য মুহূর্ত মুসলমানের জীবনে আছে বলে আমার মনে হয় না। এজন্য হজের সফরে মক্কা-মদীনার একক কোনো অনুভূতি ও অবস্থার বর্ণনা দেয়া মুশকিল। মক্কা-মদীনার প্রতিটি জিনিস ও প্রতিটি বিষয় অভাবনীয়, অবর্ণনীয় ও অপূর্ব সুন্দর।

আত্মবিলোপই প্রেমের মূল কথা। প্রেমাস্পদের আনুগত্যই প্রেমিকের একমাত্র জীবনব্রত। প্রেমাস্পদের মাঝে নিজেকে যে বিলীন করে দেয় সেই সত্যিকারের প্রেমিক। হাজীদের কাবা ঘরে তওয়াফ, সাফা-মারওয়ায় দৌড়াদৌড়ি, মিনায় অবস্থান, কংকর নিক্ষেপ, আরাফা-মুযদালিফায় অবস্থান-এসব কর্মকাণ্ডে প্রেমের এই রূপটিই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বাহ্যিক অবলোকন কিংবা যৌক্তিক মানদণ্ডে এসবের হয়ত তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু মানুষ আকল ও বুদ্ধির শাসন উপেক্ষা করে আনুগত্য, আত্মবিলোপ ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্পনের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়েই এ নির্দেশনাগুলো পালন করে থাকে। আল্লাহর ঘরের মেহমানদের তখন একটা অনুভূতিই কার্যকর থাকে, এটা আমার প্রেমাস্পদ, আমার মাহবুব আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ।

হজের প্রতিটি আহকামে হাজী সাহেবরা তাদের নিটোল, নিষ্কলুষ ও অকৃত্রিম প্রেমের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। প্রতিটি মুহূর্তে যে নিজের তপ্ত হৃদয় থেকে উৎসারিত কাতর প্রার্থনা জানায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে। নিবেদন করে তার প্রেম আকুতি গ্রহণের, তাকে আপন করে নেয়ার। প্রেমিক তার প্রেমাস্পদের সঙ্গে গোপন অভিসারে মিলিত হওয়ার দুর্বার স্পৃহা ও বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস নিয়ে যেমন ঘুরে বেড়ায় পথে প্রান্তরে, তেমনি হাজী সাহেবরাও তাদের মাওলায়ে হাকীকির প্রেমে আকুণ্ঠ নিমজ্জিত ও মাতোয়ারা হয়ে ছুটে চলে মক্কার আনাচে-কানাচে। কখনও বায়তুল্লাহয়, কখনও মিনায়, কখনও আরাফার ময়দানে আবার কখনও মুযদালিফায় খোদাপ্রেমের পসরা সাজিয়ে বসে। হজের দিনগুলোতে প্রেমের উচ্ছ্বাসে মুখর হাজী সাহেবদের প্রাণান্তকর আকুতি ও ব্যাকুল মিনতি একটাই-প্রেমাস্পদ প্রভুকে কিভাবে আপন করে পাওয়া যায়, তাঁর সন্তুটি কিভাবে অর্জন করা যায়। এজন্য খোদাপ্রেমের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে হজের কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র হজের মাধ্যমেই এই স্থুল দুনিয়ায় প্রেমাস্পদ প্রভুর সবচেয়ে কাছে পৌঁছা সম্ভব।

হজের বেশির ভাগ বিষয়ই প্রতীকী। অদৃশ্য স্রষ্টাকে সরাসরি না পাওয়ার যে খেদ তা নিবারণ করাই হজের মূল লক্ষ্য। অদৃশ্য প্রেমের অনল থেকে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া লাভের জন্যই হজ। প্রেমদগ্ধ হৃদয়ে যদি হজের মাধ্যমে সান্ত¦নার একটু পরশ অনুভব করা যায় তবেই হজের সফর সফল। আর ‘একদেহ এক প্রাণ’ যে মুসলিম উম্মাহ তার একটা উৎকৃষ্ট প্রমাণ হজের এই মিলনমেলা। ঐক্যের যে অদৃশ্য বন্ধন এই সম্মিলনের মাধ্যমে স্থাপিত হয় তা সুদৃঢ় ও স্থায়ী করার শিক্ষাই দিয়ে যায় হজ।

মানুষ আবেগপ্রবণ। আবেগের তোড়ে ভেসে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বাস্তবতার কঠিন কষাঘাতে বাঁধা পড়ে যায়। হজের সফরের পুরোটা সময়ই একজন হাজী আবেগের ফানুস উড়িয়ে হেজাজভূমিতে বিচরণ করে। কিন্তু সাড়ে তিন হাজার মাইলের পথ পাড়ি দিয়ে এদেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আবেগের ফানুস আস্তে আস্তে ফুটো হতে থাকে। জীবন-জীবিকার বাস্তব দুনিয়ায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সেই আবেগ ও অপূর্ব আবহে ধোয়া অনুভূতির কথা ভুলতে থাকে। এক সময় গতানুগতিক জীবনধারায় নিজেকে সঁপে দেয়। তবুও কালো গিলাফ ও সবুজ গম্বুজের ছায়ার একটা আবেশ তাকে নিবিষ্ট করে রাখে। সে আবেশ বার বার টেনে নিয়ে যেতে চায় স্বপ্নের সেই দেশে, কাঙ্ক্ষিত সেই ভূখণ্ডে।

*

*

Top