নিঃসীম রূপালী জলরাশির সাগরকন্যা (১)

This post has already been read 3613 times!

K 1‘প্রিয় ভুল’ বলে একটা কথা আছে। অনেক সময় ‘প্রিয় ভুল’ কাক্সিক্ষত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বাহ্যত ক্ষতি মনে হলেও সুন্দর কিছু নিহিত থাকতে পারে এর মধ্যে। এখানেও বিষয়টি প্রায় এমনই ঘটেছে। আল্লামা গহরপুরী রহ. স্মারকগ্রন্থের ডকুমেন্টারীর জন্য গত বছর আগস্টের প্রথম দিকে আমরা বরিশাল-পটুয়াখালী সফর করেছিলাম। কিছু ইন্টারভিউ ও ছবি সংগ্রহ করে চলে এসেছিলাম। বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার খুব কাছাকাছি গিয়েও ‘অফ পিক সিজন’ হওয়ার কারণে যেতে পারিনি। মনে বড় খেদ ছিল। প্রকাশ না করলেও মনে মনে ভেবেছিলাম, দুর্গম পথ মাড়িয়ে আর হয়ত আসা হবে না। কুয়াকাটা ভ্রমণের সাধও পূর্ণ হবে না। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই অলৌকিকভাবে কুয়াকাটা সফরের এমন সুযোগ এসে যাবে তা ভাবতেও পারিনি। হাই রেজুলেশনের যে দামী ক্যামেরা মোবাইলে ছবিগুলো ধারণ করা হয়েছিল রাজু ভাইয়ের সে মোবাইলটি হঠাৎ ঘর থেকে উধাও। ছবিগুলো কোথাও কপি করেও রাখা হয়নি। এদিকে স্মারকের কাজ শেষ পর্যায়ে, ছবিগুলো লাগবেই। আমি রাজু ভাইকে বার বার তাগাদা দিচ্ছি ছবিগুলো কিভাবে ব্যবস্থা করা যায় তা ভাবার জন্য। তাকে এজন্য খুব একটা আফসোস বা বিচলিত হতে দেখিনি। ভাবখানা এমন, যেন আবার ছবি তুলে নিয়ে আসা ডাল-ভাত। আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, আগে কুয়াকাটা যেতে না পারলেও এবার আমাদের কুয়াকাটা সফর হবে। ছবিও তুলে আনা হবে।

আমি ভেবেছিলাম এটা সান্ত্বনার কথা। পাঙ্গাশিয়ার ছবি ছাড়াই স্মারক বের করতে হবে। কিন্তু হঠাৎ শুনি আমরা এবার বরিশাল-পটুয়াখালী যাচ্ছি, কুয়াকাটাও ঘুরে আসব। সিলেটের আল্লামা নূরউদ্দীন গহরপুরী রহ.-এর একমাত্র ছেলে, গহরপুর জামিয়ার প্রিন্সিপাল মুসলেহুদ্দীন রাজু ভাই আর আমি কমন। আমাদের উভয়ের বন্ধু আব্দুল গাফফার রানা ভাই বরিশালের ছেলে হিসেবে গতবারের সফরেও সঙ্গী ছিলেন, এবারও সঙ্গী হওয়ার সদয় সম্মতি দিয়েছেন। অনেক ব্যস্ত মানুষ। তার শিডিউল না হওয়ার কারণেই আমাদেরকে বারবার পেছাতে হয়েছে। আব্দুল গাফফার ভাই সাথী হলে এ সফর নিয়ে আমাদের আর ভাবনার কিছু থাকে না। তিনি লঞ্চের ভিআইপি কেবিন বুকিং দিয়ে রেখেছেন। এবার তিনি একা যাচ্ছেন না, স্বপরিবারে। তিনজনের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর রাজু ভাই বললেন, আরেকজনকে সফরসঙ্গী করা যাক। কাকে করা যায়? এনায়েত দাদা মাত্র কয়েকদিন আগে কুয়াকাটা ঘুরে এসেছেন, এখন বললেও যাবেন না। আমি প্রস্তাব করলাম গাজী সানাউল্লাহর নাম। রাজু ভাই একবাক্যে লুফে নিলেন। কারণ গাজীর মতো প্রিয়ভাষী, প্রত্যুৎপন্নমতি আমুদে সফরসঙ্গী হলে সফরের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়ে যায়। গাজীর সফরসঙ্গী হয়ে ইতোমধ্যে এর যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছি।

K 2ডেটলাইন ১৯ মে ২০১১। বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যার একটু আগেই আমি ও গাজী পৌঁছে গেছি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। আমাদেরকে লঞ্চের সময়টা একটু আগেই বলা হয়েছে। সপ্তাহের শেষ দিন হওয়ায় মনে হচ্ছিল পুরো ঢাকা এখন সদরঘাটমুখী। বৃহত্তর বরিশালসহ দক্ষিণবঙ্গের লোকদের যাতায়াত পথ সদরঘাট উপচে পড়া ভিড়ে টলটলায়মান। মাথা উঁচু করে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল লঞ্চগুলো। যেন লঞ্চ নয়, এক একটি গ্রাম। লঞ্চগুলো ছেড়ে যাওয়ার সতর্ক সংকেত, যাত্রীদের কোলাহল, ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাকÑসব মিলিয়ে মুখর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ লঞ্চ টার্মিনালটি। সদরঘাটের সবচেয়ে প্রাণমুখর ও যৌবনদীপ্ত সময় এটি। সাঝের বেলা বুড়িগঙ্গা পাড়ের নিত্যদিনের এ দৃশ্যটিও উপভোগ করার মতো।

কিছুক্ষণের মধ্যে রাজু ভাই এসে পৌঁছে গেলেন। আমাদের লঞ্চ সুন্দরবন-২। লঞ্চের দুটি ভিআইপি কেবিন। সেদিন দুটিই আমাদের জন্য বুকিং দেয়া হয়েছে। কেবিনে ঢুকে গাজী তো থ বনে গেল। ভিআইপি কেবিন যে এত ভিআইপি হতে পারে তা তার ধারণার বাইরে ছিল। আমি আগেও লঞ্চের ভিআইপি কেবিনে বরিশাল গিয়েছি। সুতরাং আমরা কাছে বিস্ময়ের কিছু না। কিছুক্ষণের মধ্যেই রানা ভাই ভাবী ও ফুটফুটে দুটি ছেলে নিয়ে পাশের কেবিনে এসে উঠলেন। কিন্তু পেছনে পেছনে কেবিন বয় মুখ শুকনো করে এসে জানাল, ম্যানেজার পাঠিয়েছে। দুটি ভিআইপি কেবিন দেয়া যাবে না। ঝালকাটি জেলা জজ বা এডিসি টাইপের কোনো ভিআইপি চলে আসায় এ ছাড়টুকু দিতে হবে। রানা ভাই বরিশালের ভাষায় কেবিন বয়কে আচ্ছা করে ঝাড়ি দিলেন। গো ধরে বসলেন, কোনোক্রমেই কেবিন ছাড়বেন না। যেহেতু তিনি বরিশালের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য, আর লঞ্চের স্টাফদের সবাই তাকে চিনে-জানে, এজন্য বিকল্প কী ব্যবস্থা করা যায় তা নিয়ে প্রায় দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। অবশেষে আরেকটি ফ্যামেলি কেবিন ব্যবস্থা করে রানা ভাইকে সান্ত্বনা দিল। রানা ভাই আমাদের জন্য ভিআইপি কেবিন ছেড়ে দিয়ে নিজে চলে গেলেন ফ্যামেলি কেবিনে।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বীরের মতো গর্জন ছেড়ে বাঁশি বাজিয়ে আমাদের লঞ্চটি সদরঘাট থেকে ছেড়ে গেল। বুড়িগঙ্গার বুক ছিঁড়ে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলছে লঞ্চটি। কেবিনের গ্লাস দিয়ে বুড়িগঙ্গার দু’পাড়ে বৈধ-অবৈধ গড়ে ওঠা বিল্ডিংগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। রাতের আলোকোজ্জ্বল ঢাকার অসাধারণ চিত্রটি আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই কেবিন বয় স্পেশাল চানাচুর ভর্তা এবং চা-বিস্কুট নিয়ে হাজির। সদ্য বাজারে আসা লিচুর আঁটি আমাদের সঙ্গেই আছে। ভাবীকে কেবিনে রেখে রানা ভাই এসে আমাদের সঙ্গে আড্ডায় বিভোর হয়ে গেলেন। বউ-বাচ্চা যে একই লঞ্চে আছে সে কথা যেন তার স্মরণই নেই। আমরা মাঝে মাঝে ধাক্কিয়ে ভাবীর খবর নেয়ার জন্য পাঠিয়েছি। গাজী সানাউল্লাহর বিরামহীন চুটকি, গল্পের ফুলঝুড়িতে লঞ্চের কেবিনটা মুখরিত হয়ে উঠতে বেশিক্ষণ লাগেনি। রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আলোচনামুখর পরিবেশটাকে অনেকটা টক শো টাইপের কিছু মনে হচ্ছিল। রানা ভাইয়ের তিন চার বছর বয়সী অতি ভদ্র ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মুখায়ব পাঠ করছিল। সেও মাঝে মাঝে আমাদের সবার মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠছিল।

অর্ডার দিয়ে পাকিয়ে পছন্দ মতো মেন্যু দিয়ে রাতের খাবারটা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। রাতের খাবারের পর একটু হাঁটা দরকার। আর নদীর বুকে ভাসমান এই নৌযানটির বাসিন্দাদের হালচিত্র একটু না দেখলেও নয়। আমাদের হন্টন শুরু হলো লঞ্চের এ মাথা থেকে ও মাথায়। এক তলা থেকে অন্য তলায়। লঞ্চের ডেকের দৃশ্যটা সবচেয়ে আকর্ষণীয়। মধ্য রাতে নদীর বুক ছিঁড়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে বিশালদেহী লঞ্চটি। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভেতরে কোলাহলমুখর পরিবেশ। বিনোদনের সহজ মাধ্যম টিভি চলছে তলায় তলায়, কেবিনে কেবিনে। ডেকের বিশাল টিভির পর্দায় বাংলা সিনেমা দেখতে দেখতে কারো চোখ ঘুমে নেথিয়ে এসেছে। কেউ কেউ বসে বসেই টলছেন। কেউ ঢলে পড়েছেন ঘুমের কোলে। নারী-পুরুষ দিব্যি শুয়ে আছে পাশাপাশি। যারা এই পরিবেশে চলে অভ্যস্থ তাদের জন্য কোনো বিষয় না। কিন্তু নতুন কারো জন্য পরিবেশটাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়া কষ্টকর। স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য এই লঞ্চ জার্নিটা মন্দ না। খাবার দাবার, কাঁথা-বালিশ নিয়ে সন্ধ্যায় সদরঘাট থেকে লঞ্চের এক কোণায় কোনো রকম জায়গা করে বসতে পারলে ভোরে বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালে। মাঝে মোটামুটি ঘুমও হয়ে যায়। ভাড়াও মোটামুটি সাশ্রয়। কেবিন ভাড়া করা যাত্রীরা তো পুরোপুরি বাড়ির মতো সুযোগ সুবিধাই উপভোগ করেন। তাদের ঘুমের তেমন কোনো ব্যাঘাতও ঘটে না। সব মিলিয়ে লঞ্চের ভ্রমণটা আরামদায়ক ও উপভোগ্য। একবার এই ভ্রমণের স্বাদ কেউ বারবার মনে চাইবে বরিশালের কোথাও লঞ্চে ঘুরে আসতে।

বরিশালে আমাদের নামার কথা থাকলেও আমরা নামিনি। কারণ রানা ভাইয়ের বউ-বাচ্চাকে ঝালকাটি পৌঁছে দিতে হবে। ঝালকাঠিগামী এ লঞ্চটি বরিশালে থামবে ভোর রাতে। ঘুমের ব্যঘাত যাতে না হয় সেজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ঝালকাঠিতেই নামব। কীর্তনখোলা ও কালজিরা নদী পেরিয়ে সকাল সাতটায় আমাদের লঞ্চটি ঝালকাঠি পৌঁছে। আমরা অনেকটা আয়েশী ভঙ্গিতে সবাই নেমে যাওয়ার পর লঞ্চ থেকে নামলাম। সুগন্ধা নদীপাড়ের ঝালকাঠি শহরে এই প্রথম। ঝালকাঠি নামটি এসেছে মূলত জালের কাঠি থেকে। এই এলাকার গঞ্জে এক সময় জেলেরা জালের কাঠি বিক্রি করতো। সেখান থেকেই নাম হয়েছে ঝালকাঠি। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এ জেলার সন্তান। জেলার আয়তন খুব একটা বড় না। ঝালকাঠি শহরে প্রাচীনত্বের ছাপ থাকলেও আভিজাত্যের তেমন কোনো ছাপ লক্ষ করা যায়নি। শহরের প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ ব্যবসায়ীই হিন্দ্।ু ছিমছাম, মফস্বলীয় আমেজ ধরে রাখা একটি শান্ত শহর হিসেবেই মনে হলো সকালের ঝালকাঠিকে। সড়ক ভবনের পাশেই রানা ভাইদের বাসা। এখানে থাকেন তার বড় ভাই। তাদের বাড়ি শহর থেকে একটু দূরে গালুয়ায়।

সকালের নাস্তা সেরে ঝালকাঠি শহরটি একটু ঘুরে দেখার জন্য একটু রিকশায় চড়ে বসি চারজন। দেখার মতো তেমন কিছু না থাকলেও একটি নতুন জেলা শহরে আমাদের আগমন ঘটেছেÑসে আনন্দই বা কম কিসে! ছোট্ট এই বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা তো এখনও ঘুরে দেখা হয়নি। প্রতিটি জেলাতেই তো দর্শনীয় কিছু না কিছু অবশ্যই আছে। তবে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান থেকে দর্শন ও উপভোগের তৃপ্তি পাওয়ার জন্য দরকার একটি সংবেদনশীল হৃদয়, অন্তর্চক্ষুর প্রখরতা। অনুমান করলাম, সে গুণটি আমাদের মধ্যে কিছু আছে। কারণ দৃষ্টিস্পর্শী তেমন কিছু না থাকলেও ঝালকাঠি শহরটি আমাদের ভালো লেগেছে। শহরের অদূরেই এন এস কামিল মাদরাসা। বাংলাদেশের প্রথম সারির হাতে গোনা কয়েকটি আলীয়া মাদরাসার একটি। নাম শুনেছি অনেক, এবার দেখার পালা। এ মাদরাসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর বরিশালের বিশিষ্ট বুযুর্গ কায়েদ সাহেব রহ.-এর স্মৃতি। মাদরাসা কমপ্লেক্সটি আমাদের কাছে চমৎকার মনে হলো। পরিসর সুবিশাল ও পরিকল্পিত। সবুজে ঢাকা পুরো মাঠ। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে নদী নিরবধি। ছাত্রসংখ্যাও মনে হলো প্রচুর। সুশৃঙ্খল, গোছানো ও পরিপাটির দিক থেকে অন্যান্য আলীয়া মাদরাসা থেকে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আমরা কায়েদ সাহেব হুজুরের মাজারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জিয়ারতের দুআ সারলাম। মাজারে থাকা খাদেমরা আমাদেরকে ঘিরে ধরল শিকারীর মতো। কিন্তু আমাদেরকে শিকার করতে ব্যর্থ হলো। কারণ বরিশালের ছেলে রানা ভাই আছেন সঙ্গে।

কুয়াকাটা যেতে গাড়ি ভাড়া করতে আমরা শহরের ক্রীড়া সংস্থার মাঠের পাশে ফিরে এলাম। রানা ভাই গাড়ির খোঁজ নিচ্ছেন। এই ফাঁকে গাজী আবিষ্কার করলেন ছেলেরা ক্রীড়া সংস্থা মাঝে ক্রিকেট প্র্যাকটিস করছে। তাদের সঙ্গে খাতির জমিয়ে ব্যাট-বল নিয়ে গাজী আমাদের ডাকল। ক্রিকেটে অনভ্যস্থ আমার মতো আনাড়ী খেলোয়ারও এই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলাম না। দশ পনের মিনিটের চমৎকার একটি ইনিংস সম্পন্ন করলাম। স্মরণীয় হয়ে থাকল ঝালকাঠি ক্রীড়া সংস্থা মাঠ। মনে থাকবে চিরদিন ঝালকাঠির কথা।

ঝালকাঠি থেকে আমাদের এবারের যাত্রা সরাসরি কুয়াকাটায়। একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করা হলো দুদিনের জন্য। আমাদের চারজনকে নিয়ে চালক-ভাতিজা গাড়ি টানছে সর্বোচ্চ গতিতে। ঝালকাঠি থেকে বরিশাল, সেখান থেকে কুয়াকাটা। রাস্তার হিসেবে খুব বেশি দূরত্বের না। কিন্তু বরিশাল-কুয়াকাটা রাস্তার দূরত্ব যাই হোক মাঝে পাঁচটি ফেরি পার হওয়া লাগে। শেষ পনের কিলোমিটারে তিনটি ফেরি। খাল-বিলের বরিশালে এখনও ফেরিগুলো রয়ে গেছে মানুষের দুর্ভোগের বাহন হিসেবে। প্রতিটি ঘাটে গিয়ে গাড়িগুলো চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অপর পাড় থেকে ফেরি এলেই যেতে হবে। যতক্ষণ ফেরি গাড়ি দ্বারা পূর্ণ না হবে ততক্ষণ ছাড়বে না। ঘাটে এসে ফেরি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা মানে ভাগ্য সুপ্রসন্ন। নদীতে একটু জোয়ার বেড়ে গেলে ফেরি চলাচল বন্ধ। গাড়িগুলোও বিকল। ফেরার সময় যার ভুক্তভোগী আমরা হয়েছিলাম।

পথ যেন আর ফুরোতে চায় না। রাস্তার অবস্থাও খুব ভালো না। কাজ চলছে ঢিমেতালে, শেষ হবে কবে আল্লাহ মালুম। আমাদের চোখে মুখে সাগরকন্যার দুর্বার হাতছানি, পথের কষ্ট খুব একটা গায়ে মাখলাম না কেউই। প্রতি ফেরিতে কিছুক্ষণ যাত্রাবিরতি। চা পানের সুযোগ। গাড়ির বদ্ধ পরিবেশ থেকে বাইরের মুক্ত হাওয়া গায়ে লাগাতে পারা। সব মিলিয়ে ভালোই লাগল। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, প্রতি ফেরিতেই চেনা কিছু মানুষের দেখা মিলল, আগের ফেরিতে যারা সহযাত্রী ছিলেন। মুখের ভাষায় না হলেও মনের অভিব্যক্তি তাদেরকে আপন হিসেবেই ভাবছিল। পর পর তিন ফেরিতে ফুটফুটে একটি শিশুকে দেখে মনে হচ্ছিল খুব কাছের কেউ। নিজের প্রিয় শিশুটির কথা মনে পড়ে যাওয়ায় আমাদের কেউ কেউ এই শিশুটিকে কোলে নিয়ে আদরও করেছেন। (চলবে)

*

*

Top