প্রশ্নফাঁস: কওমির ঐতিহ্যে ভয়ংকর কালিমা

Qawmi-Babor

This post has already been read 167 times!

জহির উদ্দিন বাবর
আমাদের দেশের ত্রিমুখি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কওমি শিক্ষা অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের ধারক। কওমি মাদরাসার কিছু বিষয় নিয়ে আমরা প্রায়ই গর্ব করি। যেমন এখানে কোনো সেশনজট নেই, নেই ভর্তি বাণিজ্য। প্রশ্নপত্র ফাঁস, নকল প্রবণতা কিংবা ফলাফল জালিয়াতির কোনো ঘটনা ঘটে না। এখানকার ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে যে সম্পর্ক এর কোনো নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। সময়ানুবর্তিতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, নিজেকে গড়ে তোলার অদম্য বাসনা এসব ক্ষেত্রে কওমি শিক্ষার্থীরা বরাবরই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। জাতীয় পর্যায়ে এসব বিষয় ব্যাপকভাবে চর্চিত না হলেও কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা এই গুণগুলোর কথা ভালোভাবেই জানেন এবং গর্ববোধ করেন।

কিন্তু কওমি মাদরাসার শত বছরের এই ঐতিহ্য কি অক্ষুণœ আছে? সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রশ্নফাঁসের ঘটনা কওমি মাদরাসার ইতিহাসে ভয়ংকর কালিমা লেপন করেছে। গত কয়েক বছর ধরে আমরা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের নানা খবর শুনে আসছি। ঘোষণা দিয়ে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে রাষ্ট্রযন্ত্রকেও অনেকটা অসহায় দেখা গেছে। যদিও মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী আসার পর পাবলিক পরীক্ষায় ব্যাপকভাবে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, যে কওমি মাদরাসায় জীবনে কোনোদিনও এ ধরনের অভিযোগ শোনা যায়নি সেখানে প্রশ্নফাঁসের খবর ফলাও করে এসেছে সব গণমাধ্যমে। এটা কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের জন্য কতটা লজ্জার ও গ্লানির তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

গত ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয় দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা। সারাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সমন্বিত বোর্ড আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতির কওমিয়াহর অধীনে এবার তৃতীয়বারের মতো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। তিন চারটি পরীক্ষা হওয়ার পর প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি সবার সামনে চলে আসে। এমনকি ১৩ এপ্রিল যে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল সেই পরীক্ষার প্রশ্ন এক দুই দিন আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াতে থাকে। একই সময়ে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মেশকাত জামাতের প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়ে যায়।

১৩ এপ্রিল ভোরে কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে বৈঠকে বসে এবং প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি যে পরীক্ষাগুলো হয়ে গেছে সেগুলোও বাতিলের পক্ষে মত আসে। যদিও সবগুলো পরীক্ষা বাতিলের প্রয়োজন ছিল কি না সেটা নিয়ে ভিন্নমত আছে। তবে কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় বিস্মিত হয়। কারণ অতীতে এমন কোনো অভিজ্ঞতা কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের ছিল না। এজন্য এমন অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি মুরব্বিরা অত্যন্ত সিরিয়াসভাবে নেন এবং পরীক্ষা বাতিল করে শবে বরাতের পরে আবার নতুন তারিখে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফার পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়। এতে আসমান ভেঙে পড়ে কর্তৃপক্ষের মাথার ওপর। পরীক্ষা বাতিল করে করণীয় সম্পর্কে জরুরি বৈঠকে বসেন তারা। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় পরীক্ষা কয়েক মিনিট আগে প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পাঠানো হবে। প্রথমে বিষয়টি অসম্ভব মনে হলেও হাইয়্যাতুল উলয়ার নিবেদিত নেতৃবৃন্দ অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সব কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে সবগুলো পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেন।
আল হাইয়্যা ও বেফাকের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ফাঁস তদন্তে পৃথক কমিটিও করা হয়। এই কমিটি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তকাজ চালায়। মিশকাত জামাতের প্রশ্ন ফাঁসের অন্যতম হোতা হিসেবে ময়মনসিংহ অঞ্চলের একজন নেগরানকে শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষ। তাকে বেফাক অফিসে এনে স্ট্যাম্পে লিখিত জবানবন্দিও তারা গ্রহণ করেছেন। হাইয়্যার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত হোতারাও কয়েকজন শনাক্ত হয়েছে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।

দুই দফায় কওমি মাদরাসার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি মূলধারার মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হয়। যেহেতু দাওরায়ে হাদিসের সনদের স্বীকৃতির মাধ্যমে কওমি মাদরাসা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে সুতরাং মিডিয়ার ফোকাস এদিকে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অনেকে এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে স্বীকৃতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। আগে যেহেতু এই সনদের স্বীকৃতি ছিল না তাই এই পরীক্ষাকে কেউ সিরিয়াসভাবে নিতো না। কিন্তু এখন মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি হওয়ায় সার্টিফিকেট অর্জনটাকে অনেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য যেকোনো মূল্যে ভালো ফলাফল করার একটা প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলে আসতে শুরু করেছে। এ কারণেই টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন কেনার অনেকগুলো প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কওমি মাদরাসায় যারা পড়াশোনা করেন তাদের কাছে নিছক কাগজের সার্টিফিকেট অর্জন করাই মুখ্য নয়। দীর্ঘকাল ধরে এখানে ইলমি যোগ্যতা অর্জন করাটাকেই মুখ্য হিসেবে দেখা হয়েছে। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার তেমন গুরুত্ব নেই কওমি মাদরাসায়। যেকোনো মূল্যে ভালো ফলাফল করতে হবে এমন প্রবণতা কোনোকালেই কওমি অঙ্গনে ছিল না। হ্যাঁ, কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে ভালো ফলাফল করার অদম্য স্পৃহা আমরা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখে এসেছি। এর মাধ্যমে তারা কুরআন-হাদিস ও আনুসঙ্গিক বিষয়াদির ওপর গভীর পা-িত্য অর্জনে সক্ষম হয়। এভাবেই সমাজে যোগ্য আলেম তৈরির মহান দায়িত্ব পালন করে আসছে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাধারা কওমি।

তবে এখন দিন পাল্টেছে। কওমি মাদরাসাকে একসময় ‘খারেজি’ বলে কটাক্য করা হলেও এখন আর তা নেই। গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স (এরাবিক ও ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান দিয়ে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে। এই সার্টিফিকেট নিয়ে এখন কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি মিলতে পারে। এজন্য স্বাভাবিকভাবেই এখন কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কাছে ইলমি যোগ্যতার চেয়ে যেকোনো মূল্যে ভালো ফলাফল করা, সার্টিফিকেট অর্জন করা মুখ্য হয়ে যাবে। স্কুল-কলেজ ও আলিয়া মাদরাসার অনেক প্রবণতা আস্তে আস্তে আসতে শুরু করবে কওমিপড়–য়াদের মধ্যে। কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতির সময়ই অনেকে এই আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন। স্বীকৃতির কারণে একটা সময় কওমি মাদরাসা তার নীতি, আদর্শ ও ঐতিহ্য থেকে সরে পড়তে পারে এমন শঙ্কার কথা তখন অনেকেই উচ্চারণ করেছিলেন। তবে বৃহৎ কল্যাণের কথা ভেবে সবাই সম্মিলিতভাবেই কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি গ্রহণ করেছেন। সুতরাং এই স্বীকৃতি নেয়া কতখানি ঠিক হলো বা না হলো এটা নিয়ে বিতর্কের আর অবকাশ নেই।

এবারের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কওমি মাদরাসার গায়ে একটি কালিমা লাগিয়ে গেল। যারা ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তারাই মূলত এই প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছেন। অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন ফাঁস করেছেন এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। যেভাবেই হোক প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে এবং দুই দফায় পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়ায় প্রায় অর্ধলাখ শিক্ষার্থীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে এটাই সত্য। সামান্য নৈতিকতার লেশ মাত্র থাকলে কারও পক্ষে এভাবে প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়া সম্ভব নয়। পোশাকে-আশাকে এবং অবয়বে পাক্কা দীনদার হলেও তার দ্বারা যে বে-দীনের কাজ হতে পারে সেটার প্রমাণ রেখেছেন তারা। তারা কওমি মাদরাসার জন্য বিষফোঁড়ার মতো। তাদের চিহ্নিত করে এখনই অপসারণ করতে হবে। না হলে পুরো অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়বে এই ক্যানসার।

দুই দফায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার পর কওমি মাদরাসার পরীক্ষাপদ্ধতি আরও আধুনিক করার নানা প্রসঙ্গ এখন আলোচিত হচ্ছে। দায়িত্বশীলরাও বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। প্রযুক্তির সহযোগিতায় প্রশ্নফাঁস যে ঠেকানো সম্ভব সেটাও প্রমাণিত হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটি আগামীতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে কী কী উপায় অবলম্বন করা যায় এ ব্যাপারে তাদের সুপারিশও তৈরি করছে বলে জানা গেছে। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সিরিয়াসভাবে নিলে প্রশ্ন ফাঁসের মতো অনৈতিক কর্মকা- রোধ করা অসম্ভব কিছু নয়। মূলত আগে চক্রটি চিহ্নিত করতে হবে। কোন পর্যায়ের কারা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের আগে শনাক্ত করতে হবে। তারা যত ক্ষমতাধরই হোক কওমির সুরক্ষার স্বার্থে তাদের সরাতে হবে।

অনেকের মনে থাকার কথা, ২০০০ সালের দিকে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রতি কেন্দ্র থেকে বস্তা ভরা নকল উদ্ধার করা হতো। পরবর্তী সরকারের একজন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এই নকলের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করলেন। তিনি হেলিকপ্টার নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে গিয়ে পর্যন্ত নকল ধরেছেন। এই নকল প্রক্রিয়ার সঙ্গে কারা জড়িত তাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ায় জাতি নকলের মহামারি থেকে অনেক রক্ষা পায়। বছরখানেক আগেও এসএসসি-এইচএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের হিড়িক পড়ে। সেই সময়কার শিক্ষামন্ত্রী বড় বড় ঘোষণাও দিয়েও পেরে উঠতে পারছিলেন না। এর মধ্যেই নতুন সরকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসেছেন নতুন মন্ত্রী। ইতোমধ্যে দুটি বড় পাবলিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের বড় কোনো অভিযোগের খবর পাওয়া যায়নি। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ায়। কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে যে পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় যেকোনো জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব সেটা প্রমাণিত।

মূলত এই পরীক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যত লোক জড়িত সবাই কিন্তু অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত নন। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন এই অপকর্ম করে থাকেন। তাদেরকে চিহ্নিত করা গেলে অপরাধ প্রবণতা রোধ করা অসম্ভব কিছু নয়। বিশেষ করে কওমি মাদরাসার পরীক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে এমন লোকদেরই সম্পৃক্ত করা উচিত যাদের ভেতর তাকওয়া-পরহেজগারি কিছুটা হলেও আছে। যারা আল্লাহকে ভয় করে তারা কখনও জঘন্য এই কাজের সঙ্গে জড়িত হতে পারেন না। আর যাদের অন্তরে আল্লাহ-রাসুলের কোনো ভয় নেই তারাই মূলত দীনকে দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দিতে সামান্যও কুণ্ঠিত হন না।

প্রায় দুশো বছরের ইতিহাসে কওমি মাদরাসা একটি টার্নিং পয়েন্টে অবস্থান করছে। প্রথমবারের মতো বৈষয়িক প্রাপ্তির বিষয়টি এই শিক্ষাধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় পতনের ধাক্কা এতে লাগবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এই ধাক্কাটি যেন ভয়ংকর রূপ ধারণ না করে; কওমি মাদরাসার ঐতিহ্যকে যেন চুরমার করে না দেয় সেদিকে সংশ্লিষ্টদের অনেক বেশি খেয়াল রাখতে হবে। এই অঙ্গনের সিংহভাগ মানুষ ঠিক থাকলে আশা করা যায় কোনো ঝড়-ঝাপ্টাই কওমি মাদরাসার সোনালি ঐতিহ্যকে ধূসরিত করতে পারবে না।

Related posts

*

*

Top