ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য

This post has already been read 2782 times!

এশিয়া কাপে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ চলাকালে একটি পাকিস্তানি টেলিভিশন চ্যানেলে এক বিশ্লেষক দেশের ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ আনেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও ব্যাপক লেখালেখি চলতে থাকে। পাকিস্তান টিম বাংলাদেশের টাকা খেয়ে ম্যাচ হেরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। এটি পাকিস্তানের ওই ক্রিকেট টিম যারা মাত্র দুই দিন আগে বীরত্বের সঙ্গে মোকাবেলা করে ভারতের স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে। অথচ মাত্র দুদিনের মাথায় পাকিস্তানের শিক্ষিত মহল ক্রিকেটারদের ওপর অপবাদ দিচ্ছেন ম্যাচ ফিক্সিংয়ের।

বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম নিজেদের মাঠে তিন উইকেটে ৫০ ওভারে ৩২৬ রান করে। এটাই একদিনের ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। জবাবে ব্যাট করতে নেমে প্রথম দিকে পাকিস্তান ক্রিকেট টিম কিছুটা ধীরগতিতে খেলছিল। এ সময়ই পাকিস্তানি মিডিয়ায় ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের এক সদস্য আসাদ ওমর আমার কাছে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগের প্রেক্ষাপট জানতে চান। তার বক্তব্য ছিল, এখনো তো খেলা শেষ হয়নি, এর আগেই কেন ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ।

টিম খারাপ খেললে সমালোচন অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার আগেই অভিযোগের তীর বসিয়ে দেয়া শত্রুর হাতকে শক্তিশালী করারই হীন চেষ্টা। মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই আফ্রিদি-ঝড় বাংলাদেশের স্বপ্নকে ধূলিস্মাৎ করে পাকিস্তানকে বিজয়ের দাঁড়প্রান্তে এনে দেয়। পরে ওমর আকমলের নৈপুণ্যে যখন পাকিস্তান বিজয় লাভ করে তখন গ্যালারিতে উপস্থিত বাংলাদেশী দর্শকদের চোখে ছিল অশ্রু আর চেহারায় বিষণ্নতার ছাপ। বাঙালি অনেক মেয়েকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেছে।

ঢাকার ওই স্টেডিয়ামে পাকিস্তান সমর্থক কিছু লোকও উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তানের বিজয়ে তারা আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করছিলেন। পাকিস্তান সমর্থকদের বেশির ভাগই ১৯৭১ সালে আটকেপড়া পাকিস্তানি, যারা ঢাকায় বিহারি ক্যাম্পে বসবাস করেন। তারা এখনো নিজেদেরকে পাকিস্তানি হিসেবে পরিচয় দেন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় যখন পাকিস্তান বাহিনী অপারেশন চালায় তখন তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গ দিয়েছিলেন। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হলে বিহারিদের ওপর দুর্দিন নেমে আসে। তবে তারা আজও নিজেদেরকে পাকিস্তানি হিসেবে পরিচয় দেন।

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ একদিকে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং শিক্ষিত সমাজের অজ্ঞতার মুখোশ খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে উপমহাদেশের এমন কিছু তিক্ত বিষয় সামনে চলে এসেছে যা ভারত-পাকিস্তানিরা এড়িয়ে যান। একথা বলতে আমি কুণ্ঠিত নই যে, পাকিস্তানের যত ক্ষতি শিক্ষিতরা করেছেন তা করেননি অশিক্ষিত-গ্র্রাম্য লোকেরা। তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে যে, একটি ক্রিকেট ম্যাচে বিপক্ষ দল ভালো খেললে নিজেদের টিমের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু হয়ে যায়। নামধারী এই শিক্ষিতরা মূলত একটি মাইনসেটের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেই মাইনসেটের কারণে তারা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে কুফুরির ফতোয়া লাগায়, গাদ্দারির তকমা আরোপ করে এবং দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট কেটে নেয়। কাউকে আমেরিকা-ভারতের এজেন্ট বানিয়ে দেয়, কাউকে তালেবানদের সহযোগী সাব্যস্ত করে নিজেকে লিবারেল ফ্যাসিজমের অন্তর্ভুক্ত ভাবতে থাকে।

মৌলভী শ্রেণীর লোকদের মধ্যে একধরনের প্রান্তিকতা আর লিবারেল স্যেকুলার শ্রেণীর মধ্যে আরেক ধরনের প্রান্তিকতা। দুই শ্রেণীই চরমপন্থী। উভয়ের লড়াইয়ে পাকিস্তানের সাধারণ জনগোষ্ঠী লাশের বোঝা বহন করছে। এক শ্রেণী ক্রিকেটকে অপছন্দ করছে এবং বলছে ক্রিকেট যুবকদের জিহাদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। অন্য শ্রেণী ক্রিকেটের উন্মাদনা উস্কে দিচ্ছে। আর কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই নিজ দেশের ক্রিকেটারদের ‘অপরাধী’ বানানোকে নিজের দেশপ্রেমের পরিচয় বলে মনে করছে। এই শ্রেণীটি ভুলে যায় যে, ২০০২ সাল থেকে এই দেশে সেনা অভিযান ও বোমা হামলা অব্যাহত আছে। বিদেশী কোনো ক্রিকেট টিম পাকিস্তানে আসতে রাজি হচ্ছে না। অথচ যে বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ সাব্যস্ত করে সেনা অভিযান চালানো হযেছিল আজ তাদের দেশেই এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তারপরও অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়ার যেন শপথ করে বসে আছেন সবাই।

এক বাংলাদেশী ক্রিকেটার মুহাম্মদ তালহা ও ওমর গুলের বলে ছক্কা মারায় আপনার দেশপ্রেমে আঘাত লেগেছে। এজন্য নিজ দেশের ক্রিকেট টিমের ওপর বিশ্বাসঘাতকতার অপবাদ আরোপ করছেন। আপনি কি এটা দেখছেন না যে, আমাদের টিম নিজ দেশে আন্তর্জাতিক কোনো ক্রিকেট টিম খেলার সুযোগই পাচ্ছে না। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের রাজনৈতিক অপছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করা সিদ্ধান্তগুলো সারা দুনিয়ায় তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। একদিনের মধ্যেই ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক ও ম্যানেজার পাল্টে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও এই টিম ভারতের মতো সুসংহত একটি দলকে হারিয়ে জাতির মাথা উঁচু করেছে। অথচ কিছু লোক গৌরবের এই বিষয়টিকে ব্যক্তিপূজায় পরিণত করছে। পাকিস্তান টিম বাংলাদেশ দলকে তিন উইকেটে পরাজিত করেছে। না হলেও সমালোচকরা ওমর গুলের ওপর না জানি কত অপবাদ আরো করতো! ২ মার্চ ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে তার অসাধারণ ছক্কার কথাও হয়তো ভুলে যেতো।

এশিয়া কাপের ম্যাচগুলো শুধু পাকিস্তানের শিক্ষিত শ্রেণীর দেওলিয়াত্বকেই উন্মোচিত করে দেয়নি, ভারতের স্যেকুলারিজমের মুখোশও খুলে দিয়েছে। ২ মার্চ ভারতের প্রসিদ্ধ শহর মিরাটে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ দেখছিল। পাকিস্তান ম্যাচ জেতার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কমন রুমে কাশ্মিরের শিক্ষার্থীরা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেয়। সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেল সুপার জিএইচ হেনসালকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। তিনি পুলিশ ডেকে ৬৭ কাশ্মিরি ছাত্রকে বের করে দেন। পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মঞ্জুর আহমদ ওই ৬৭ ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন। জিএইচ হেনসালকে ভারতীয় মিডিয়া প্রশ্ন করেছিল, ওই ৬৭ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কি কোনো তদন্ত হয়েছিল? তিনি উত্তরে বলেন, ওই শিক্ষার্থীরা পাকিস্তানের পক্ষে স্লোগান দিয়েছে, এটা তাদের গাদ্দারি। এখন তারা পাকিস্তান চলে যাক। অন্য এক ঘটনায় ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের বিজয়ে উল্লাস প্রকাশ করায় এক কাশ্মিরি যুবককে গলাকেটে হত্যা করে। স্থানীয় পুলিশ তিন ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। তবে সেনা সূত্র জানায়, এই হত্যা মামলার রায় কেবল সামরিক আদালতই দিতে পারে।

একদিকে কাশ্মিরিদের আজও পাকিস্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার অপরাধে গলাকেটে হত্যা করছে ভারতীয় বাহিনী আর অন্যদিকে বাংলাদেশ; সেখানে আজও বিহারিরা পাকিস্তানের বিজয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। তবে সেখানে কাউকে গলাকেটে হত্যা করা হয় না। এটাই ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য। কিন্তু আমাদের সরকার বাংলাদেশের পরিবর্তে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।

সবশেষ একটি তিক্ত বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। ওই ক্ষমতাসীন এবং বুদ্ধিজীবীরা যারা নিজেদের বলিষ্ঠ পাকিস্তানি বলে দাবি করেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, যে বিহারিরা আজও বাংলাদেশে অবস্থান করে পাকিস্তানের বিজয়ে আনন্দ-উল্লাস করে তাদের ঢাকা থেকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা কেন করছেন না? তারা তো পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল। তাদেরকে কেন মানবেতর ও বন্ধুত্বহীন অবস্থায় সেখানে ফেলে রেখেছেন? এ ব্যাপারে আপনাদের পাকিস্তানিত্ব কোথায়?

৬ মার্চ ২০১৪ বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের দৈনিক জং-এ প্রকাশিত হামিদ মীরের উর্দু লেখা থেকে অনুবাদ। হামিদ মীর: পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক; প্রধান নির্বাহী, জিও টিভি।

*

*

Top