মানুষের কত টাকার প্রয়োজন!

Taka_zahirbabor

This post has already been read 88 times!

 

জহির উদ্দিন বাবর

ক্ষমতাসীন দলে চলছে শুদ্ধি অভিযান। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন এমন কয়েকজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। এই তালিকায় আছেন আরও অনেকে। গণমাধ্যমে প্রতিদিনই আসছে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে গড়া অঢেল সম্পদের ফিরিস্তি। ক্ষমতাসীন দলে মাঝারিমানের নেতাদের সম্পদের যে বিবরণ উঠে আসছে তাতে চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা। অনেকে আবার প্রশ্ন তুলছেন, মাঝারি নেতাদের অবস্থা এই হলে শীর্ষ আর ডাকসাইটে নেতাদের অবস্থা কী হবে! যদিও এই ব্যাকরণ প্রয়োগ করা উচিত হবে না। কারণ দলের বড় নেতা হলেই যে অবৈধ অর্থ উপার্জনে এগিয়ে থাকবেন এমনটা নাও হতে পারে।

মূলত দলে যারা শীর্ষ পদে যান তাদের একটা বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থাকে। সেটা তারা তিলে তিলে গড়ে তোলেন। সামান্য অর্থের লোভে পড়ে তারা সেটা সাধারণত নষ্ট হতে দেন না। সুযোগ পেলেই অবৈধভাবে অঢেল অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলার প্রবণতা সাধারণত দেখা যায় দলের মাঝারি এবং পাতি টাইপের নেতাদের মধ্যে। তাদের কাছে বৈষয়িক উন্নতিই দল করার মুখ্য উদ্দেশ্য। এজন্য তারা ক্ষণে ক্ষণে রঙ পাল্টায়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তারাও পাল্টে যান। আর ক্ষমতার রাজনীতির কারণে প্রতিটি দলই সুবিধাবাদী এই শ্রেণিটিকে আশ্রয়-প্রশয়ও দেয়।

যেভাবেই হোক ক্ষমতাসীন দলে এ ধরনের একটি শুদ্ধি অভিযান জরুরি ছিল। সরকারপ্রধানের এই উদ্যোগ ঘরে-বাইরে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। দলের গুটিকতক মানুষ এই অভিযানে অখুশি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে তৃণমূল পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাকর্মী এতে খুশি। যারা নানা অপকর্ম করে দলের বদনাম করছিল তাদের লাগাম টেনে ধরা দেখে সবার ভেতরে একটা স্বস্তির ছাপ দেখা গেছে। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে। আর দেশের সিংহভাগ জনসাধারণ তো রীতিমতো বাহবা দিচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা, এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকুক এবং শুধু রাজধানীতেই নয়, সারাদেশে চলুক। সরকারি দলের পক্ষ থেকেও সে কথাই জানানো হয়েছে।

মূলত একটা দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে বেপরোয়া একটা ভাব চলে আসে স্বাভাবিকভাবেই। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। প্রথম দুইবারের তুলনায় এবার তারা অনেক বেশি অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং স্বস্তির জায়গায় অবস্থান করছে। কারণ আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদেরকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো শক্তি নেই। সুতরাং দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা বেপরোয়া ভাব চলে আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এটা যে দলের জন্য ক্ষতির কারণ সেটা অন্যরা না বুঝলেও ঠিকই বুঝতে পেরেছেন দলীয় প্রধান। এজন্য নিজের মানুষদের ওপর অনেকটা নির্মম হয়েছেন। অনেকে ভাবতেও পারেননি নিজ দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তারা রাজনৈতিকভাবে এতটা বিপন্ন হতে পারেন। মূলত এটা ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’র মতো অবস্থা। এর দ্বারা আওয়ামী লীগ সভাপতি লাখ লাখ নেতাকর্মীকে একটি বার্তা দিতে চাচ্ছেন। সেটা হলো কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। সেই বার্তাটি গ্রহণ করলে নিজেদের জন্যই লাভ।

ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো নেতার খাইখাই ভাব দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, একজন মানুষের কত টাকা প্রয়োজন? কোটি কোটি নয়, অনেকে শত শত কোটি টাকার মালিক। অর্থ-সম্মান কোনোকিছুতেই পিছিয়ে নেই, তবুও কেন ‘আরও চাই’ ভাব। সুযোগ পেলেই অর্থ উপার্জনে অবৈধ পথ কেন মাড়াতে হবে? অনেকে নিজের সন্তান-সন্তুতির কথা ভেবে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন। অথচ সন্তানের জন্য সম্পদের চেয়ে শিক্ষাদীক্ষা এবং নৈতিকতাবোধ অনেক বেশি প্রয়োজন। যারা নিজেরা অবৈধ উপার্জনে অঢেল সম্পদ গড়ে তোলেন তারা তাদের সন্তানদের কী নৈতিকতা শেখাবে!

মূলত বিষয়টি গভীরভাবে ভাববার। আমরা যত সম্পদই উপার্জন করি, একদিন তো সবকিছু রেখেই চলে যেতে হবে। কোনো কিছুই তো সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাহলে কেন সম্পদ গড়ার এই প্রতিযোগিতা! মূলত নীতি-নৈতিকতার চেয়ে বৈষয়িক দিকগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণেই আজ আমাদের সমাজের এই দুরাবস্থা। সমাজের সুস্থ ও স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখতে হলে বৈষয়িক প্রাপ্তির চেয়ে নীতি-নৈতিকতাবোধ এবং আত্মিক প্রশান্তির দিকটি গুরুত্ব দিতে হবে। ভোগের চেয়ে ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। না হলে সমাজের পতন কেউ ঠেকাতে পারবে না।

*

*

Top