সুবর্ণচরের বিবর্ণ চেহারা ও আমাদের সমাজ

Subornachor_zahirbabor

This post has already been read 155 times!

জহির উদ্দিন বাবর
গত ৩০ ডিসেম্বর দেশে অনুষ্ঠিত হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটাকে আদৌ ‘নির্বাচন’ বলা যাবে কি না সেটা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। তবে ভোটের নামে প্রহসনের আলোচনাকে ছাপিয়ে গেছে নির্বাচনের রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। ওই রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক নারীকে তার স্বামী-সন্তানদের সামনে গণধর্ষণ করেছে মানুষ নামের ৯ পশু। ওই নারীর ‘অপরাধ’ ছিল ধানের শীষে ভোট দেয়া। যারা এই বর্বরতার সঙ্গে জড়িত তাদের সবার পরিচয় সরকারি দলের লোক। এক সময়ের বিএনপি প্রভাবিত ওই এলাকায় এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ভিন্ন দলের কোনো সমর্থক থাকুক সেটা এখন আর তারা সহ্য করতে পারছে না। সারা দেশ যখন নৌকার কথিত জোয়ারে ভাসছে তখন ওই পরিবারটি ধানের শীষের সমর্থন করে ‘মহাঅন্যায়’ করেছে এবং এর শাস্তি হিসেবেই ওই নারীকে নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে।

ঘটনাটি ৩০ ডিসেম্বর রাতের হলেও তা ফলাও করে প্রচার হতে এক-দুই দিন সময় লেগে যায়। প্রথমে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ওই পরিবারটির ওপর নানা চাপও দেয়া হয়েছে। পুলিশ এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে সেটা স্বীকারই করতে চায়নি। তবে এক পর্যায়ে প্রভাবশালী কয়েকটি মিডিয়ায় নিউজটি চলে আসায় তা আর ধামাচাপা দেয়া সম্ভব হয়নি।

এই ঘটনার মূল হোতা স্থানীয় প্রভাবশালী এক নেতা। তার নাম রুহুল আমিন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যও ছিলেন। এক সময়ের ‘ভূমিহীন’ রুহুল আমিন এখন ওই এলাকার ‘জমিদার’। অবৈধ উপায়ে কামিয়েছেন অঢেল সম্পদ। তার কথায় চলে পুরো এলাকা। তার ভয়ে মুখ খোলার দুঃসাহস নেই সেই এলাকার কারও।

দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তোলপাড় করা ঘটনাটি এক পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। মূল হোতা রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে ক্ষমতাসীন দল বহিষ্কারও করেছে। তবে এই ঘটনায় রুহুল আমিনসহ অভিযুক্তদের বিচার আদৌ হবে কি না তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ। ঘটনাটি যে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে সেটা পরিষ্কার ওই মহিলার স্বামীর বক্তব্যে। তিনি অভিযোগ করেছেন, তিনি পড়াশোনা জানেন না। তাকে মামলার চার্জশিট পড়ে যেভাবে শোনানো হয়েছিল সেভাবে মামলাটি করা হয়নি। মূল অভিযুক্ত রুহুল আমিনের নামই চার্জশিটে নেই। এর দ্বারাই অনুমান করা যায় প্রভাবশালী রুহুল আমিনেরা কখনও বিচারের মুখোমুখি হবে না। এখন মিডিয়া ও দেশবাসীর নজর থাকার কারণে সাময়িকভাবে কিছু তৎপরতা হয়ত দেখানো হবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত রুহুল আমিনেরা জেল থেকে বেরিয়ে আবার সেই অপকর্ম অব্যাহত রাখবে।

এমন সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণও আছে। বছরদুয়েক আগে বগুড়ার তুফান সরকার কাণ্ডের কথা হয়ত অনেকের স্মরণ আছে। শ্রমিক লীগ নেতা তুফান এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করেন। এই খবর তার স্ত্রী ও শ^শুরবাড়ির লোকজন জানতে পেরে ওই কলেজছাত্রী এবং তার মাকে ডেকে মাথা ন্যাড়া করে দেয়। ঘটনাটি তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল তখন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের এ ধরনের অপকর্মের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। কোনো ঘটনা ঘটলে কয়েক দিন মিডিয়ায় কিছুটা আলোচনায় থাকে। পরে আর সেই খবর কেউ নেয় না। মিডিয়ার ফোকাস সরে যাওয়ার পর প্রভাবশালী সেই নেতারা আগের মতোই অপকর্মে ডুবে যায়।

সুবর্ণচরের ঘটনাটি দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে ছুঁয়ে যায়। কতটা বর্বর, হিংস্র, অসভ্য ও নোংরা মানসিকতার হলে ভোট না দেয়ার কারণে এমন কা- ঘটাতে পারে! যে নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে সেই নারী চার সন্তানের জননী। নিজের স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে প্রকাশ্যে এই কা- ঘটিয়েছে নয়জন। তারা ওই নারীকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। তাদের আচরণে প্রতিহিংসার প্রমাণ স্পষ্ট। সেই নারী এখনও হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তাদের এই কা-কে পশুর সঙ্গে তুলনা করলে পশুদের অপমান করা হবে। মানুষরূপী এই কীটগুলো পশুর চেয়েও বর্বর। তারা যে কা- ঘটিয়েছে তা লজ্জা দিয়েছে গোটা মানবতাকে।

দল ও মতের ভিন্নতাই হলো গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য। আমার দলকে সমর্থন না করলেই তার সঙ্গে পশুসুলভ আচরণ করতে হবে-এটা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। যে দলের লোকজন এই কা- ঘটিয়েছেন তারা তো এবার ভোট কম পাননি। কোথাও কোথাও মোট ভোটের চেয়ে বেশি তারা নিজেদের বাক্সে আগের রাতেই ভরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাহলে একটি পরিবারের কয়েকটি ভোট না পাওয়ায় তাদের এমন কী আসে যায়! এই ঘটনায় পরিষ্কার, তারা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না। ভিন্নমতের কেউ থাকুক সেটাও তারা মানতে পারে না। এই মনোভাব কোনো দলের জন্যই ভালো না। ভিন্নমতকে দমন করে সাময়িক তৃপ্তি পেলেও এর প্রতিক্রিয়া ভয়ংকর। মানুষের অন্তরের কষ্ট ও ক্ষোভগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে যেদিন বিস্ফোরণ ঘটবে তা থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।

যে দলই এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকুক তা কখনও সমর্থনযোগ্য নয়। কোনো দলের পরিচয়ে কেউ এই ধরনের কা- ঘটালে সেই দলের উচিত তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া। অতি উৎসাহী এসব লোক কোনো দলে না থাকলে এমন কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না। তারা দলকে তেমন কিছু দেয় না, তবে এ ধরনের কাণ্ড ঘটিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করে। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা দল বা সরকারের ওপর বর্তানোর কথা নয়। কিন্তু যখন দল বা সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপরাধীকে রক্ষা করার পাঁয়তারা করে কিংবা ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে তখন সেই দায় সংশ্লিষ্ট দলের ওপরই বর্তায়। সুবর্ণচরের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল বাহ্যত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও পরোক্ষভাবে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে সেটা স্পষ্ট। এ কারণেই বিরোধী পক্ষগুলো এই ঘটনার দায় সরকারি দলের ওপর চাপানোর সুযোগ পাচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের উচিত এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

ভোটের পর প্রতিহিংসামূলক কিছু ঘটনার খবর আমরা ২০০১ সালের নির্বাচনের পরেও পেয়েছি। সেই ঘটনাগুলো এখনও দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এবারের ঘটনার একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো, একজন নারী এভাবে লাঞ্ছিত হলেও আমাদের দেশের নারীবাদীদের তেমন কোনো প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। তারা যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে। সুবর্ণচরের ওই নারীকে ধর্ষণের ঘটনা দেশবাসীকে কাঁদালেও কথিত নারীবাদীদের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ কথিত এই নারীবাদীদের আচরণ সবসময় এক থাকে না।

মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে দেশের খ্যাতনামা এক আইনজীবী ও প্রথমসারির নাগরিক একজন নারী সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে চরিত্রহীন বলতে চাই’। এই একটি মাত্র মন্তব্যের ‘অপরাধে’ সেই আইনজীবী এখনও কারাভোগ করছেন। সেই সময় দেশের সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে কথিত সুশীল সমাজ, নারীবাদীরা একযোগে হামলে পড়ে ওই আইনজীবীর ওপর। কত বিক্ষোভ, কত মানববন্ধন, জেলায় জেলায় কত মামলা! টক শো আর সংবাদপত্রের পাতাগুলো কয়েক দিন ভরপুর ছিল সেই ‘মহাঅন্যায়ের’ প্রতিবাদে।

যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ হোক সেটা সভ্য সমাজে সবারই কাম্য। কিন্তু কেউ কেউ বা একটি শ্রেণি যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ দেখায় তখন তাদের আর সমাজে কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আমাদের দেশের কথিত সুশীল সমাজ আর নারীবাদীরা সবসময়ই সুবিধাবাদী। যেখানে তাদের স্বার্থ জড়িত, যেখানে তাদের উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হবে, যেখানে কথা বললে বিদেশি ফান্ড পেতে সহায়ক হবে সেখানে তারা খুব সরব। যেখানে তাদের কোনো স্বার্থ নেই; যখন কথা বলাকে নিজেদের জন্য অনুকূল মনে করে না তখন তারা নিশ্চুপ। তাদের এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের বিষয়টি এখন আর কারও অজানা নয়। তারা মূলত পরগাছা। বিশেষ গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নেই তাদের মূল উদ্দেশ্য। মানবাধিকার, নারী অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এগুলো তাদের সস্তা স্লোগান। বস্তাপচা সেই স্লোগানগুলো এখন আর কেউ সেভাবে গ্রহণ করে না।

সুবর্ণচরের ওই ঘটনার পর শুধু নারীবাদীরা নয়, সমাজের কোনো স্তর থেকেই জোরালো প্রতিবাদ হয়নি। অন্যায় দেখতে দেখতে দিন দিন আমাদের মধ্যে যেন তা সহনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। বীভৎস ও ন্যাক্কারজনক ঘটনায়ও আমরা এখন আর তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাই না। এটি একটি সমাজের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। এটা সমাজের অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণ। আমাদের সমাজব্যবস্থায় যে পচন ধরেছে সেটা এখন আর গোপনীয় কিছু নয়। তবে সমাজের বিবেক ও দায়বোধ বলে যে বিষয়টি আছে সেটা হারিয়ে গেলে কঠিন বিপদ অপেক্ষা করছে। তবে এবার ওই ঘটনার পর একটি বিষয় ভালো লেগেছে, আলেম-উলামার পক্ষ থেকে কিছু কিছু প্রতিবাদ হয়েছে। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সুবর্ণচরের ধর্ষকদের ফাঁসি দাবি করেছে। কোনো কোনো আলেম সুবর্ণচরে গিয়ে সেই নারীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে অনেকেই ছুটে গেছেন, এই ইস্যুটাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা অনেকে করেছেন। কিন্তু এসব ঘটনা যখন ঘটে তখন তা আর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে দেখা কিংবা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনা ঠিক নয়। এগুলো সামাজিকভাবে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সোচ্চার হয়ে দমন করতে হবে।

রাজনীতিতে নানাজনের নানা মত ও পথ থাকবে; কিন্তু এই সমাজ ও দেশের স্বাভাবিক গতিধারা বজায় রাখতে সবাইকে মানবিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সমাজে পচন ধরলে সবকিছুতেই পচন ধরবে। তা থেকে কেউ বাঁচতে পারবে না। এজন্য সমাজের পচন রোধ করতে সবাই মিলেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

Related posts

*

*

Top