একটি নিষ্ঠুতার গল্প ও দায়বোধের প্রসঙ্গ

This post has already been read 1350 times!

জহির উদ্দিন বাবর
fathar_zahirbabor1পৃথিবীতে বাবার চেয়ে আপনজন আর কে আছে? একজন বাবা তার জীবনের সবটুকু তিলে তিলে ব্যয় করে গড়ে তোলেন সন্তানকে। নিজের আরাম-আয়েশের কথা চিন্তা না করে সন্তানের জন্য সবকিছু করেন। বাবার পৃষ্ঠপোষকতায় সন্তান একদিন বড় হয়ে ওঠে, পৌঁছে উচ্চতায়। সেই সন্তান যদি বড় হয়ে নিজের শিকড় ভুলে যায়, বাবাকে আর স্মরণ রাখার প্রয়োজন বোধ না করে তাহলে নিশ্চয়ই সেই সন্তান কুলাঙ্গার। এমন কুলাঙ্গার সন্তানদের কথা আমরা প্রায়ই শুনি।

সম্প্রতি কুলাঙ্গার সন্তানের এমনই একটি করুণ গল্প আলোড়ন তুলেছে সর্বত্র। জীবনের শেষ সময়ে ‘সংসারের জঞ্জাল’ বাবা বাড়িছাড়া হতে বাধ্য হন। নিজের চাকরির টাকায় বানানো বাড়ি ছেড়ে একসময় বাবার স্থান হয় রাস্তার পাশে। এভাবে ধুঁকে ধুঁকে এক সময় মারা যান তিনি। হাসপাতালের বিছানায় বাবার লাশটি শেষবারের জন্য দেখতে আসেননি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তিন সন্তানের কেউ। উপরন্তু অপরিচিতজনের কাছে বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে বড় সন্তান জানিয়ে দিলেন, ‘জরুরি মিটিংয়ে আছি, লাশটি আঞ্জুমানে দিয়ে দিন।’

করুণ এই গল্পটি মূলত রাজধানীর উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। আসুন তার মুখেই শুনি সেই করুণ গল্পটি-
“লোকটির নাম হামিদ সরকার। তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। গ্রামের বাড়ি জামালপুরে। আমার সাথে তার পরিচয় সূত্রটা পরেই বলছি। আমি যখন উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের প্রথম শাখা উদ্বোধন করি, তখন উত্তরা পশ্চিম থানার তৎকালীন ওসি এবং মসজিদের ইমাম সাহেব আমার কাছে আসেন। তারা বললেন যে, একজন লোক অনেকদিন ধরে মসজিদের বাইরে পড়ে আছে। অনেকে ভিক্ষুক ভেবে তাকে দু-চার টাকা ভিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।

ইমাম সাহেব তার জন্য প্রেরিত খাবার থেকে কিছু অংশ লোকটিকে দিয়ে আসছেন প্রতিদিন। হঠাৎ লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তারা আমার শরনাপন্ন হয়েছেন। এমতাবস্থায় আমি লোকটিকে আমার হাসপাতালে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি এবং দায়িত্বরত ডাক্তার ও অন্যান্য সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অবগত করি যে, এই লোকটির চিকিৎসার সকল দায়ভার আমার ও এর চিকিৎসায় যেন কোন ত্রুটি না হয়।
হামিদ সরকার নামক লোকটির সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আমি রীতিমত অবাক হলাম। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসার। তার তিন ছেলের মধ্যে তিনজনই বিত্তশালী। উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে যা ছেলেদের নামে দিয়েছেন। তার বড় ছেলে ডাক্তার। নিজস্ব ফ্ল্যাটে স্ত্রী, শালী এবং শাশুড়ি নিয়ে থাকেন, অথচ বৃদ্ধ বাবার জায়গা নেই।

মেঝ ছেলে ব্যবসায়ী, তারও নিজস্ব বিশাল ফ্ল্যাট আছে। যেখানে প্রায়ই বাইরের ব্যবসায়িক অতিথিদের নিয়ে পার্টি হয়। অথচ বাবা না খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। ছোট ছেলেও অবস্থাসম্পন্ন। কিন্তু স্ত্রীর সন্তুষ্টির জন্য বাবাকে নিজের ফ্ল্যাটে রাখতে পারে না। সকল সন্তান স্বাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও বাবার স্থান হয়েছে শেষে মসজিদের বারান্দায়। সেখান থেকে আমার হাসপাতালে।

প্রসঙ্গত, আমার হাসপাতালে আগত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন হলে আমি রক্ত দেবার চেষ্টা করি। সেদিনও হামিদ সরকার নামক অসুস্থ লোকটিকে আমি রক্ত দিয়েছিলাম। অবাক করা বিষয় হলো, তিনি দিন ১৫ আমার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, অথচ কোন একটা ছেলে পনের মিনিটের জন্যও তার খোঁজ নেয়নি।

আরও দুঃখজনক হলো, সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও পনের দিন পরে আরো একটা কার্ডিয়াক অ্যাটাকে হামিদ সাহেব মারা যান। তার মৃত্যুর পরে আমি তার বড় ছেলেকে ফোন করি। তিনি আমাকে প্রতিউত্তরে জানান যে, তিনি জরুরি মিটিংয়ে আছেন এবং লাশটি যেন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে দিয়ে দেওয়া হয়।   পরে কোনো আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে আমি নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে তার লাশ যথাযথ মর্যাদায় দাফন করি। লেখাটি আমি কোন প্রকার বাহবা নেওয়ার জন্য লিখিনি। আজ আমি নিজেও একজন বাবা। সন্তানের একটু সুখের জন্য দিনরাত একাকার করছি। সেই সন্তান যদি কোনোদিন এধরনের আচরণ করে তখন আমার কেমন লাগবে, শুধু এই অনুভূতি থেকে লেখা।

আমার মনে একটা প্রশ্ন, আমরা যারা বাবা-মাকে অসম্মান, অবহেলা করি তারা কি একবারও ভেবে দেখি না যে, একদিন ওই জায়গাটাতে আমরা নিজেরা গিয়ে দাঁড়াব। আজ আমি আমার বাবা-মায়ের সাথে যে আচরণ করছি, তা যদি সেদিন আমার সন্তান আমার সাথে করে তবে? আজ আমাদের বাবা-মায়েরা সহ্য করছে। কাল আমরা কি সহ্য করতে পারব?”

দুই.
fathar_zahirbabor2চরম নিষ্ঠুরতার এই গল্পটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে পড়ার পর ওই সন্তানদের প্রতি সবাই ছিঃ ছিঃ দিয়েছেন। তাদেরকে কুলাঙ্গার সন্তান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তারা যখন শেষ বয়সে পৌঁছাবে তখন তাদের সন্তানরাও একই আচরণ করবে তাদের সঙ্গে। বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার সঙ্গে এই চিত্রটি কোনোভাবেই যায় না বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। অনেকে বলেছেন সামাজিক শিক্ষার অভাব, কেউ বলেছেন নৈতিক শিক্ষার অভাব আবার কেউ দায়ী করেছেন ধর্মীয় শিক্ষা না থাকার বিষয়টিকে।

আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের একটি ঐতিহ্য আছে। যুগ যুগ ধরে একান্নবর্তী পরিবারের ধারা টিকিয়ে রাখার জন্য সারাবিশ্বেই আছে আমাদের সুনাম। কিন্তু দিন দিন সেই সুনামে চিড় ধরছে। পশ্চিমা খোলা হাওয়ার ধাক্কায় আমাদের গর্বের জায়গাটি ধসে পড়ছে। এর কারণ হলো ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের জায়গাটি দিনদিন নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। বাইরের সংস্কৃতিতে আমরা বুদ হয়ে আছি। পশ্চিমা স্টাইল জায়গা করে নিচ্ছে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে। পশ্চিমা বিশ্বে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শেষ বয়সে বাবা-মায়ের জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তান কোনো কোনো উপলক্ষে বাবা-মাকে দেখতে যায় বছরে এক দুই দিন। এজন্য তারা ‘বাবা দিবস’ ‘মা দিবস’ নামে আলাদা দিবস আবিষ্কার করেছে। কিন্তু নির্বোধের মতো আমরাও আজ এসবের দিবসের পেছনে ছুটছি। আমরাও ঘটা করে এসব দিবস পালন করি। বাবা-মাকে দিবসসর্বস্ব ভালোবাসার কারণেই আজ আমাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এসব নিষ্ঠুরতার।

অথচ ইসলাম বছরের প্রতিদিনই বাবা-মাকে ভালোবাসতে বলেছে; শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখাতে বলেছে। বাবা-মায়ের খেদমতকে ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি বাবা-মায়ের কোনো আচরণে ‘উহ’ শব্দ বলতে পর্যন্ত নিষেধ করা হয়েছে কুরআনে। সন্তানের জান্নাত প্রাপ্তির জন্য বাবা-মায়ের খেদমতকে অন্যতম শর্ত হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের এই মহান শিক্ষা থেকে দিন দিন আমরা যত দূরে সরে যাচ্ছি ততই আমাদের মধ্যে অসভ্যতা, নির্মমতা বাসা বাঁধছে।

সন্তানের কাছ থেকে নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য বাবা-মাও কম দায়ী নয়। আমাদের সমাজে বাবা-মায়েরা সবসময় চিন্তা করেন আমার সন্তান উচ্চতর ডিগ্রি নেবে, বড় চাকরি করবে, অনেক টাকা বেতন পাবে, সমাজে তার অনেক বড় অবস্থান হবে। কিন্তু এই চিন্তা খুব কম বাবা-মা করেন যে, আমার সন্তান ধর্মীয় মূল্যবোধে বড় হবে, নৈতিকতার শিক্ষা পাবে, সততা ও আদর্শে বলীয়ান হবে। জাগতিক প্রাপ্তিটা বাবা-মায়ের কাছে বড় হওয়ার কারণেই আজ সন্তানদের এই বিপথগামিতা। এজন্য শুধু সন্তানদের দায়ী না করে প্রত্যেক বাবা-মাকেও সতর্ক হতে হবে। সন্তানকে সুশিক্ষা তথা আদর্শ ও নৈতিকতা শেখানোর দায়িত্ব বাবা-মায়ের। এই দায়িত্বে ত্রুটি করলে দুনিয়াতে যেমন সন্তানের কাছ থেকে নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হবে তেমনি পরকালে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে।

*

*

Top