সবুজে-সুন্দরে মাখামাখির একদিন

This post has already been read 2469 times!

সীমান্তের অপরূপ মায়াঘেরা ছায়াঢাকা গ্রাম বিরিশিরি। নেত্রকোনা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আমরা পাঁচ বন্ধু বেড়াতে এসেছি উত্তর-পূর্ব সীমান্তের এই পর্যটন স্পটটিতে। একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বিলবোর্ডের সুবাদে সারাদেশে বিরিশিরি মোটামুটি পরিচিত। শান্ত-স্বচ্ছ সোমেশ্বরীর সুনির্মল পানি, উজ্জ্বল বালুকাবেলা, সাদা কাশবন আর গারো-হাজংদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা নিয়েই বিরিশিরি। বর্ষায় সোমেশ্বরীর তীরবর্তী বিরিশিরির সৌন্দর্য বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বিরিশিরিতে আছে আদিবাসী কালচারাল একাডেমি। এখানে আছে টুঙ্কা বিপ্লবের কয়েকটি স্মৃতিস্তম্ভ। তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি কমরেড মনি সিংহের স্মৃতিভাস্কর আছে এখানে। বিরিশিরিতে পা রাখতেই অন্য রকম এক অনুভূতির পরশ বুলিয়ে যায় সারা গায়।
শান্ত-স্নিগ্ধ, সবুজে ঢাকা ছিমছাম পরিবেশ। পর্যটকদের চাপ নেই বললেই চলে। এখানকার উপজাতি বা আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল এই কালচারাল একাডেমি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এটি পরিচালিত হয়। উপজাতিদের সাংস্কৃতিক পরিচয় পাওয়া যায় একাডেমির জাদুঘরে। দুটি লাইব্রেরি আছে বেশ সমৃদ্ধ। একাডেমির পরিসরটা খুব বড় নয়। সবটুকু দেখতে আমাদের এক ঘণ্টাও লাগেনি। বেশ কিছুটা হাঁটতে হলো। এবার আমরা শান্ত-স্বচ্ছ সোমেশ্বরীর তীরে। আমার প্রিয় জন্মভূমির সীমানা এখানে শেষ। সীমান্ত প্রহরী বিজিবি জোয়ানদের জন্য টিলার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে স্টেশন। বুকটান করে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনটি। টিলা থেকে গড়িয়ে পড়লে সোমেশ্বরী নদী। নদীর স্রোতধারা যেমন প্রখর নয়, তেমনি আয়তনও বেশি না। ডাক দিলে ওপারে শোনা যাবে অনায়াসে। ওপারে দাঁড়িয়ে আছে দানবের মতো সারি সারি পাহাড়। প্রতিবেশী দেশের সীমানা প্রাচীরও এখানেই। তাদের সীমান্ত বাহিনীর স্টেশনও এখানে। আমাদের চোখের সামনে শান্ত-নিবিড় সোমেশ্বরী ধীরলয়ে বয়ে চলছে। ওপারে উপচে পড়া সবুজের হৃদয়কাড়া হাতছানি। উত্তরের হিমেল হাওয়া এবং সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জলধারা নিমিষেই যেন সব ক্লান্তি দূর করে দিল। সোমেশ্বরীর গভীরতাও অবিশ্বাস্য রকমের কম। শত শত লোককে দেখা গেল পানি থেকে যেন কী তুলছে! ভাবছিলাম হয়ত মাছ ধরছে। কিন্তু না, জানা গেল তারা তুলছে কয়লা। পানির নিচে ডুব দিয়ে তুলে আনছে কালো সোনা। এই কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় কল-কারখানায়। রেলগাড়িও চলে এই জ্বালানি দিয়ে। রফতানি পণ্য হিসেবে এর সম্ভাবনা প্রবল।
টিলার উপরের সেই দৃশ্যটা অপরূপ! মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য যাকে বলে! এখানে দাঁড়ালে আকাশটাকে মনে হয় ছায়া হয়ে মায়াময় গভীর আবরণে ঢেকে রেখেছে। মৃদু হাওয়ার আলতু ছোঁয়া শরীর এবং মন দুটোই ভালো করে দেয়ার মতো। আমাদের মনও যেন সেখানে গিয়ে অন্য রকম ভালো লাগার আবেশে সিক্ত হলো। এবার আমরা এসেছি রাণীখংয়ে। সোমেশ্বরীর তীরঘেষে গড়ে উঠেছে রাণীখং পাহাড়। এ পাহাড়ে রয়েছে সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। পাহাড় কেটে তৈরি করা সিঁড়ি বেয়ে আমরা উপরে উঠলাম। ছিমছাম পরিবেশে বেশ সাজানো গোছানো ও পরিপাটি গির্জাটি।
বাহারী মাটির বিস্ময়ের জন্য বিখ্যাত বিজয়পুর। সামান্য মাটি যে কত রঙ ও ধরনের হতে পারে তা বিজয়পুর না এলে কেউ ধারণাই করতে পারবে না। এখান থেকে মাটি সংগ্রহ করে সিরামিক কোম্পানিগুলো। এ জায়গাটুকু সরকারিভাবে লিজ দেয়া হয়। বস্তা ভরে ভরে মাটি নিয়ে যায়। প্রতিদিন শত শত বস্তা মাটি যাচ্ছে তবুও মাটি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। স্থানীয়দের কাছে চিনা মাটি বা সাদা মাটির পাহাড় বলে খ্যাত। পাহাড়ের পাশে আছে সুন্দর লেক। পাহাড় থেকে মাটি সংগ্রহ করায় সেখানে লেক হয়ে গেছে। লেকের পানির রঙ নীল। এমন নীল যে, মনে হবে কৃত্রিমভাবে রঙ মেশানো হয়েছে। মরিশাসের পানিও যেন এর কাছে ফেল! টলমলে স্বচ্ছ নিবিড় পানিতে একটু ডুব দেয়ার ইচ্ছে জাগবে যেকোনো পর্যটকের মনে। আমাদেরও জেগেছিল। কিন্ত সে সময় কোথায়? তাছাড়া অতিরিক্ত কাপড় তো সঙ্গে আনিনি।
মাথা উুঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের চূড়া থেকে সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলটিকে আরো সুন্দর মনে হলো। বৃষ্টিধোয়া আকাশটাকে আরো বেশি স্বচ্ছ দেখা গেল। আশেপাশে আছে অনেকগুলো পাহাড়ি টিলা। সবগুলোই চিনামাটির। সেদিক থেকে কেটে মাটি নেয়া হয়েছে সেদিকের রূপটুকু সত্যিই মোহনীয়। সাদা, লাল, নীল, বেগুনি, আকাশীÑআরো কত রঙের মাটি তাকিয়ে তাকিয়ে যেন হাসছে। মনে চাচ্ছে ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের মাটি বেশি করে নিয়ে যাই। কিন্তু সে সুযোগ তো নেই। অল্প অল্প করে সংগ্রহ করলাম সবাই। হঠাৎ খেয়াল হলো, জোঁকের আক্রমণের শিকার হইনি তো! কারণ এখানে আসার আগে সবাই জোঁকের আক্রমণের ভয় দেখিয়েছে। ঘাষের ভেতরে বড় বড় জোঁক লুকিয়ে থাকে, এদের কোনো ডর-ভয় নেই। কোন সময় যে পায়ে রক্তচোষা শুরু করে দেবে তা টেরও পাওয়া যাবে না। আর বৃষ্টির দিন হলে তো কথাই নেই। একথা শুনে আমরা মোটামুটি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। প্রতিষেধক হিসেবে এক প্যাকেট লবণ আর চুনের পানি সঙ্গেও এনেছিলাম। কিন্তু আমাদের ভাগ্য ভালো, সেদিন ছিল আলোক ঝলমল রোদ। আমরা কোনো জোঁকের দেখা পাইনি। তবে সারাক্ষণ শুধু আতঙ্কে থেকেছি, এই বুঝি জোঁক রক্ত চুষে নিচ্ছে।
সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। সবার পেট ছু ছু করছে ক্ষিধের জ্বালায়। ফিরতে হবে। সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই দুর্গম পথটুকু পার না হতে পারলে বিপদে পড়তে হবে। সবাই এক সঙ্গে মোটরসাইকেলে রওয়ানা করলাম। সূর্যকিরণ মিলিয়ে গেছে পশ্চিমা নীলিমায়। আবছা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে চারদিক। শুনশান নীরবতা জেঁকে বসেছে জনপদগুলোতে। বেসুরো আওয়াজে ভোঁ ভোঁ করে ছুটে চলেছে আমাদের চারটি মোটরসাইকেল। আমরা আবার ফিরে যাচ্ছি বাঁধাধরা জীবনের পরিচিত আঙ্গিনায়। আর সঙ্গে পুঁজি করে নিয়ে যাচ্ছি এক পশলা স্মৃতি।

*

*

Top