মিডিয়া নিয়ে আমাদের আক্ষেপ ও কিছু বাস্তবতা

জহির উদ্দিন বাবর

Media_zahirbaborবর্তমান সময়ে মিডিয়ার প্রভাব কতটা বেশি সে সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি। আজকের যুগ পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে মিডিয়া। এজন্য এই সময়ে মিডিয়াকে অনেকে ‘দ্বিতীয় খোদা’ বলে অভিহিত করেন। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে বরাবরই মিডিয়া ইসলামপন্থীদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করে থাকে। তাদের গায়ে রঙ লাগানো, ভিন্নভাবে উপস্থাপন মিডিয়ার রুটিন কাজ। ইসলামপন্থীরা মিডিয়ার একটি কাটতি আইটেম। আমরা চাই আর না চাই মিডিয়া ইসলামপন্থীদের পেছনে লাগবেই। কারণ অনেকের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হচ্ছে এর মাধ্যমে। আর বাস্তবতা হলো আমরা চাইলেও মিডিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারবো না। তাই বাস্তবতা মেনে নিয়ে মিডিয়াকে নিজেদের করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

একটা সময় আমরা এ ব্যাপারে উদাসীন থাকলেও এখন আর নই। আমাদের মুরব্বিরা অনেকেই মিডিয়া নিয়ে ভাবছেন। মিডিয়া করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছেন। মাদরাসায় পড়াশোনা করে মিডিয়ার মতো ভিন্ন জগতে যুক্ত হওয়াকে আগে বাঁকা চোখে দেখলেও এখন আর সেটা দেখা হচ্ছে না। আগে মাদরাসাগুলোতে বাংলা চর্চা নিষিদ্ধ থাকলেও এখন অনেক মাদরাসার তত্ত্বাবধানে নিয়মিত বাংলা চর্চার ব্যবস্থা হচ্ছে। সবমিলিয়েই লেখালেখি, সাহিত্য ও মিডিয়ার ব্যাপারে আলেম-ওলামার দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে।

মাতৃভাষা চর্চায় আমরা দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিলাম। প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার পর এখন মাশাআল্লাহ মাতৃভাষা চর্চার পরিমাণ একটা আশানুরূপ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সময় সচেতন প্রত্যেক আলেমই এখন কোনো না কোনোভাবে মাতৃভাষা চর্চা করছেন। আর কিছু না হোক, অনন্ত মাতৃভাষায় লিখে মনের ভাবটুকু প্রকাশের মতো সামর্থ্য নবীন আলেমরা অর্জন করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো উন্মুক্ত প্রান্তরে লেখালেখির অবারিত সুযোগ পেয়ে এখন প্রত্যেকেই কমবেশি লিখছেন, নিজের চিন্তাগুলো লিখিত আকারে প্রকাশ করছেন। বাংলা ভাষা চর্চায় এটাও একটি ইতিবাচক দিক।

আমাদের অনেকেই এখন মূলধারার মিডিয়ায় কাজ করছেন। নতুন করে অনেকেই যুক্ত হচ্ছেন। মিডিয়ায় মাদরাসাপড়–য়াদের অংশগ্রহণ দিন দিন বেড়ে চলেছে। এই উত্তরণ অবশ্যই আশা জাগানিয়া। তবে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার মতো কোনো অবস্থানে আমরা এখনো পৌঁছাইনি। কারণ আমাদের যারা মিডিয়ায় কাজ করছেন তার এখনো মিডিয়ার ‘বারান্দা’য় অবস্থান করছেন। মূল ঘরে নিজের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে আরও অনেক বাকি। মিডিয়ায় চাকরি করে কেউ কোনোদিন মূল ঘরে শক্তিশালী অবস্থান গড়তে পারবে না। মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ চাইলে অবশ্যই পলিসি মেকারদের মধ্যে যুক্ত হতে হবে। আমাদের অমুক অমুক আছেন মিডিয়ায়, তারা অমুক অমুক জায়গায় কাজ করেন এটা ভেবে যারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

মনে রাখতে হবে, মিডিয়ার নিজস্ব ক্ষমতা বলে কিছু নেই। মিডিয়া হলো কাঠের পুতুলের মতো, এটা যেভাবে চালাবেন সেভাবেই চলবে। একই মিডিয়া দ্বারা আপনি অসৎ ও অনৈতিক কাজ যেমন করতে পারেন তেমনি অনেক ভালো কাজ করারও সুযোগ আছে। সবই নির্ভর করে পলিসি মেকারদের ওপর। আর মিডিয়ার মূল পলিসি মেকিং করে মালিকপক্ষ। তাদের নির্ণয় করে দেয়া পথে চলতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পলিসি ঠিক করে নেন মিডিয়া হাউজগুলোর দায়িত্বে থাকা শীর্ষ ব্যক্তিরা। সুতরাং প্রতিটি মিডিয়া তার মালিকের আদর্শ ও বিশ্বাসের বার্তাবাহক। যিনি টাকা খরচ করে মিডিয়া হাউজ করেছেন সেই মিডিয়ায় তার আদর্শ ও বিশ্বাস প্রচার হবে এটাই স্বাভাবিক।
আমাদের অনেকেই বিভিন্ন সময় মিডিয়ার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করি। অমুক পত্রিকা, অমুক টেলিভিশন আমাদের বিরুদ্ধে এই করেছে, ওই করেছে ইত্যাদি অভিযোগ তুলি। যারা টাকা খরচ করে পত্রিকা আর টেলিভিশন করেছে তাদের উদ্দেশ্যই আপনার বিরুদ্ধে কাজ করা; সুতরাং তারা তাদের উদ্দেশ্যে অবিচল আছে। আপনি যদি তাদের বিপরীতে দাঁড়াতে চান তাহলে আপনাকে আরেকটি মিডিয়া নিয়েই দাঁড়াতে হবে।

একটি উদাহরণ দিই। দেশের অন্যতম শীর্ষ একটি শিল্প গ্রæপের নিজস্ব কোনো পত্র-পত্রিকা ছিল না। প্রতিদ্ব›দ্বী গ্রæপের মালিকানাধীন পত্রপত্রিকা যখন তাদেরকে নানাভাবে খুঁচাতে লাগল তখন তারাও মিডিয়ায় বিনিয়োগ শুরু করলো। এখন সেই গ্রæপটি সবধরনের মিডিয়া করে ‘মিডিয়া মুঘল’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। এখন আর তারা যত অপকর্মই করুক কেউ চোখ তুলে তাদের দিকে তাকানোর সাহসও পায় না। কারণ সবাই জানে তাদের দিকে ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হবে।

media2_zahirbaborইসলামপন্থীদের অভিযোগ মিডিয়া তাদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করে। এই অভিযোগ বছরের পর বছর শুনে এসেছি। অথচ যথার্থ উপায়ে এর সমাধান খোঁজার কোনো চেষ্টা তাদের মধ্যে দেখি না। জনকণ্ঠ আর প্রথম আলোর বিরুদ্ধে রাজপথে মিছিল আর পত্রিকা পোড়ানোকেই তারা নিজেদের দায়িত্ব মনে করছে। অথচ এর দ্বারা কোনো দিন মিডিয়ার গ্রাস থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না ইসলামপন্থীরা। মিডিয়া বৈরিতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হলে তাদেরও মিডিয়ার মালিক হতে হবে। মিডিয়া খাতে নিজেদের বিনিয়োগ করতে হবে। নিজেরা বিনিয়োগ না করে পরের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা মিডিয়ায় নিজেদের প্রচার চাইবেন কিংবা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আক্রমণ থেকে বাঁচতে চাইবেন তা কখনও সম্ভব নয়।

ইসলামপন্থীদের মধ্যে এখন মিডিয়া উদ্যোক্তা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। এককভাবে না হোক অন্তত অনেকে মিলে হলেও বিভিন্ন আঙ্গিকের ভালো কিছু মিডিয়া হাউজ গড়ে তুলতে পারলে তাদের আর ফাঁকা মাঠে গোল খেতে হতো না। কিন্তু মিডিয়ায় বিনিয়োগ করার মতো কোনো আলামত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। অনেকে মৌখিকভাবে মিডিয়ার প্রয়োজনের কথা স্বীকার করলেও বাস্তবে তাদের কর্মকাণ্ডে সেটার কোনো প্রমাণ মিলে না। কেউ কেউ বলতে পারেন, সামর্থ্যরে অভাবে সেটা হচ্ছে না। কিন্তু আমি এটা বিশ্বাস করতে চাই না। কারণ ইসলামপন্থীদের সামর্থ্যরে মাত্রা এখন অনেক বেড়েছে। যারা আলেম-ওলামা, যারা ধর্মকর্ম করেন, যারা একটি সত্য ও সুন্দর আদর্শে বিশ্বাস করেন এমন মানুষদের মধ্যে এখন টাকাওয়ালা অনেক। প্রচুর টাকা তারা নড়াচড়া করেন। মিডিয়ায় বিনিয়োগ করতে চাইলে খুবই সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনবোধ, পরিকল্পনা এবং মানসিকতা কোনোটাই নেই।

কোটি টাকার ওপরে বছরে ব্যয় হয় এমন মাদরাসার সংখ্যা দেশে অনেক। আলেমদের তত্ত্বাবধানে শত কোটি টাকা খরচ করে মসজিদ নির্মাণের খবরও আমরা পাই। অথচ কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ছোটখাট কিছু মিডিয়া হাউজ গড়লে বা যেগুলো গড়ে উঠেছে তাদের সহায়তা করলে অবস্থার অনেক উন্নতি হতো। দেশের বৈরী মিডিয়াগুলো ইসলামপন্থীদের নিয়ে খেলা করতে একটু হলেও ভয় পেতো। লেখালেখি, সাংবাদিকতা ও শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চায় যেসব ছেলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হতো। কিন্তু সে দিকে নেই কারও কোনো মনোযোগ। সবাই ব্যস্ত নতুন নতুন মসজিদ আর মাদরাসা নির্মাণ নিয়ে। মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণের প্রয়োজন কখনোই অস্বীকার করার নয়। কেয়ামত পর্যন্তই এর প্রয়োজন থাকবে। তবে ইসলামী ধারার মিডিয়ায় বিনিয়োগ করা; উদ্যোক্তা হয়ে কিছু মিডিয়া হাউজ প্রতিষ্ঠা করা এমন আলেমের সংখ্যাও তো দুই চারজন থাকা চাই। না হলে মিডিয়া নিয়ে আক্ষেপ যতই করুক কোনোদিন এর থেকে পরিত্রাণের সুযোগ মিলবে না।

আমরা সবকিছুই একটু দেরিতে করি। মাতৃভাষা চর্চায় আমরা অনেক দেরিতে যুক্ত হয়েছি। এতে আমাদের হারাতে হয়েছে অনেক কিছু। পত্রপত্রিকার প্রয়োজনও হয়ত আমরা এক সময় বুঝবো। যখন বুঝবো তখন দেখা যাবে এসবের যুগ পেরিয়ে নতুন কোনো যুগে চলে গেছে বিশ্ব। আগে একটি মাসিক পত্রিকাকেই কার্যকরী মিডিয়া মনে করা হতো। পরে সাপ্তাহিক আর পাক্ষিককে। এক পর্যায়ে এলো দৈনিকের যুগ। সেই যুগ পেরিয়ে এখন টেলিভিশন, রেডিও আর অনলাইন মিডিয়ার যুগে আছি আমরা। এর কোনোটিতেই আমাদের কোনো প্রভাব নেই। এগুলোর প্রয়োজন যখন বুঝবো তখন হয়ত তা অকার্যকর হয়ে যাবে। এভাবে পিছিয়ে থেকেই আমাদের চলতে হবে-এই যদি হয় নিয়তি তাহলে তো আর বলার কিছু নেই। তবে যদি মনে করি আমরা সময়কে সঙ্গ দেব তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। যুগের চাহিদা আর সময়ের প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কথায় বলে, যে যুগের ভাষা বুঝে না সে গাফেল গাফেল!!

Related posts

*

*

Top