তাদের ‘খয়রাতি’ আচরণ পুরোনো, এবার কি শুধরাবে!

জহির উদ্দিন বাবর

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী পত্রিকা আনন্দবাজার। বাংলা ভাষার বহুল পঠিত এই পত্রিকাটি বরাবরই বাংলাদেশের খবর গুরুত্ব দিয়ে ছাপে। তবে তাদের বিভিন্ন নিউজে বাংলাদেশের প্রতি একটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব ফুটে ওঠে। সম্প্রতি পত্রিকাটি বাংলাদেশ নিয়ে কুরুচিপূর্ণ সাংবাদিকতার চরম নজির স্থাপন করেছে। চীনের কাছ থেকে পাওয়া ব্যবসায়িক সুবিধাকে তারা বাংলাদেশের জন্য ‘খয়রাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। তাদের নিউজে ব্যবহৃত চরম অবমাননাকর শব্দটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে আনন্দবাজার অবশেষে বাধ্য হয় ক্ষমা চাইতে। এটাকে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ দাবি করে বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চায় এবং দুঃখ প্রকাশ করে। তবে তাদের এই শব্দ চয়নটি যে অনিচ্ছাকৃত ছিল না, তারা যে সজ্ঞানে এটা ব্যবহার করেছে এটা তাদের অতীত কর্মকাণ্ড দেখলে পরিষ্কার।

আনন্দবাজারের সাংবাদিকরা ‘লাদাখের পরে ঢাকাকে পাশে টানছে বেজিং’ শিরোনামের এই খবরে মূলত তাদের জাতীয়তাবাদী চেহারার নোংরা চরিত্রটির বহিঃপ্রকাশ ঘটান। সীমান্তে চীনা সেনাদের হামলায় তাদের বেশ কয়েকজন সেনা নিহত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে তারা তখন ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিন্তু সেই ক্ষুব্ধতা চীনের ওপর প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশকে তারা হেয় করেন। এটা মূলত নিজেদের মনের ঝাল মেটানোর চেষ্টা। তাদের প্রত্যাশা ছিল, চীনের সঙ্গে সংঘাতের মুহূর্তে বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক বাংলাদেশ সেটা করেনি। আর এতেই ক্ষুব্ধতার চরম প্রকাশ ঘটিয়েছেন তারা।

আনন্দবাজার তাদের সংবাদের ভেতরে ‘খয়রাতি’ শব্দটি ব্যবহার করলেও পশ্চিমবঙ্গের আরেকটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জিনিউজ সরাসরি শিরোনামে শব্দটি ব্যবহার করেছে। বাহ্যত এটি একটি শব্দ, এটি ব্যবহারে একটি দেশের তেমন কিছু আসে যায় না। কিন্তু একটু গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রকে চরম অবমাননা করা হয়েছে শব্দটি দ্বারা। যাদের মধ্যে সামান্য দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধ আছে তারা এটি মেনে নিতে পারেন না। অন্য সময় আনন্দবাজারের এ ধরনের নোংরা সাংবাদিকতার খুব বেশি প্রতিক্রিয়া না হলেও এবার হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি থেকে শুরু করে সব দল-মতের মানুষেরাই এর প্রতিবাদ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

যেভাবেই হোক আনন্দবাজার কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তারা ‘ভ্রম সংশোধন’ শিরোনামে দুঃখ ও ক্ষমা প্রকাশ করে। যেহেতু তারা ক্ষমা চেয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়াই হলো মহত্তের পরিচয়। কিন্তু তাদের চারিত্রিক যে বৈশিষ্ট্য সেটার পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য ততটা সহায়ক না হওয়ায় তারা এভাবে ব্যাকফুটে চলে যায়। এশিয়ার পরাশক্তি চীনের সঙ্গে তারা প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। পাকিস্তান তাদের চির বৈরী। একসময়ের পরম বন্ধু ছোট্ট রাষ্ট্র নেপালও কিছুদিন যাবত তাদেরকে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে। যে বাংলাদেশকে তারা সবসময় নিজেদের অনুগত হিসেবে বিবেচনা করে সেই বাংলাদেশও এমন সংকটকালে তাদের প্রতি সমর্থন জানায়নি। সবমিলিয়েই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ভারত মোটামুটি একঘরে। প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো নয়। এই অবস্থায় তাদের কিছুটা নমনীয় হওয়া ছাড়া উপায় নেই।     

ভারতের মতো চীনও বাংলাদেশের একটি বন্ধু রাষ্ট্র। চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক সুবিধা নিতেই পারে, এতে তাদের ক্ষুব্ধতার কোনো কারণ দেখি না। ভারত চাইলেও বাংলাদেশকে এমন সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু অতীত তো বলে, ভারত সেই সুযোগ বাংলাদেশকে কখনও দেয়নি। কথিত বন্ধু রাষ্ট্রটির সঙ্গে এখনও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। আমরা একদম ফ্রি ট্রানজিট দিয়ে দিলেও তারা আমাদেরকে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক সুবিধা দেয়নি। তিস্তার পানির জন্য বাংলাদেশ হাহাকার করছে সেই কবে থেকে, এখনও তাদের মন গলেনি। অন্য সীমান্তগুলোতে মার খেলেও বাংলাদেশ সীমান্তে এসে তাদের বাহাদুরির শেষ নেই। ফেলানীর মতো নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা তাদের সীমান্ত বাহিনীর নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। আর বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর বিষয়টি তো ওপেন-সিক্রেট। এই অবস্থায় তাদের কাছ থেকে অবজ্ঞাসূচক আচরণ পাওয়া বাংলাদেশ আরেক বন্ধুরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে কোনো ‍সুবিধা নিতেই পারে। এটাকে খয়রাতি বলা চরম ধৃষ্টতা।

আনন্দবাজার লিখেছে, ‘বাণিজ্যিক লগ্নি আর খয়রাতির টাকা ছড়িয়ে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা নতুন নয় চীনের।’ অথচ ভারত নিজেই ঋণ বা খয়রাতিতে জর্জরিত। অর্থনৈতিক সূচকে দেশটির অবস্থা করুণ। ভারতের বিদেশ থেকে নেয়া মোট খয়রাতির বা বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩১ মার্চ ২০২০ পর্যন্ত ৫৬৩.৯ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ খয়রাতি দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ২০% এর বেশি। এই ঋণগুলো ভারত নিয়েছে বিভিন্ন মাল্টিল্যাটারাল, বাইল্যাটারাল উৎস থেকে- যার মধ্যে রয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইডিএ, আইবিআরডি ও আইএফআইডি। বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণও ভারতের থেকে অনেক কম। শতাংশের হিসাবে অর্ধেক। বাংলাদেশ সুবিধা পেলে ভারতের মিডিয়ায় যদি তা খয়রাতি বলে আখ্যায়িত হয় তবে ভারতের ঋণ কেন খয়রাতি হবে না? সুতরাং যেখানে নিজেদের পাছায় ছিদ্রে ভরপুর সেখানে অন্যের ছিদ্রান্বেষণ কেন!

দুই.

বাংলাদেশ সম্পর্কে আনন্দবাজারসহ পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সংবাদমাধ্যমগুলোর একটা তাচ্ছিল্যের ভাব সবসময়ই চোখে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিদের নাম তারা কখনোই সঠিকভাবে লিখবে না। প্রাচীন এই পত্রিকাটির একটি নিজস্ব বানানরীতি আছে। কিছু কিছু বানানে তারা নিজস্ব স্টাইল ফলো করে। বানানের ব্যাপারে যারা এতো সচেতন তারা সম্মানী মানুষদের নাম দিনের পর দিন ভুল ছাপবে, এটা হতে পারে না। এর মানে হচ্ছে তারা ইচ্ছা করেই বাংলাদেশকে, এদেশের মানুষদের হেয় করার জন্য এভাবে লিখে। বাংলাদেশের জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম আনন্দবাজার ‘সুরাবর্দী’ লিখে। বাংলাদেশের ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্ত্তজাকে লিখে ‘মশরফি’, অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে তারা ‘শাকিবুল হাসান’ মাহমুদুল্লাহকে মামুদুল্লা লিখে। এছাড়া মওদুদকে লেখে মদুদ, জয়া আহসানের নাম লেখে জয়া এহসান,  রাজ্জাককে ‘রজ্জাক’, আনিসুল হককে ‘আনসুল হক’। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে তারা বারবার ‘নুসরত জহান রফি’ লেখে।  

এই যে তারা এভাবে লেখে এটা তাদের ভুল বা নিজস্বতা নয়, স্রেফ বিকৃতি। বাংলাদেশ ও এদেশের নাগরিকদের হেয় করার অপচেষ্টা।  অনেকে হয়ত বলবেন, তারা ‘সচিন তেন্ডুলকর’ বা ‘সোনিয়া গাঁধি’ লেখে। এখানে মনে রাখতে হবে, শচিন টেন্ডুলকার বা সোনিয়া গান্ধী বাঙালি নন, বাংলায় তাদের নাম কী লেখা হলো তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু যারা বাঙালি তাদের নামের বিকৃতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যিনি যার নাম যেভাবে লেখেন, এমনকি সেটা ভুল হলেও সংবাদপত্রে সেভাবেই লেখা উচিত। এটাই সাংবাদিকতার নীতিমালায় বলা হয়। শফিক রেহমান কিংবা শামসুর রাহমানকে কেউ ‘রহমান’ লিখলে সেটা ভুল হবে। তাদের নাম নেওয়ার সময় তারা যেভাবে লেখেন সেভাবেই লিখতে হবে। কিন্তু আনন্দবাজার সংবাদপত্রের জগতে খান্দানি ভাব দেখালেও এখানে তাদের আচরণ খুবই নিকৃষ্টমানের।

আনন্দবাজার, ভারত সরকার কিংবা দেশটির নাগরিকদের একটি কথা সবসময় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। হোক আপনাদের তুলনায় অনেক ছোট, অনেক দুর্বল, কিন্তু আপনাদের অধীনস্থ নয়। ছোট কিংবা দুর্বল বলে নিজেদের প্রদেশগুলোর মতো আচরণ করবেন, এটা সভ্য দুনিয়ায় কেউ মেনে নেবে না। বন্ধুত্ব নির্ভর করে দ্বিপক্ষীয় আচরণের ওপর। আমরা একতরফা আপনাদের সমীহ করে যাবো, না চাইতেই সবকিছু দিয়ে দেবো, আর আপনারা আমাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন, ন্যায্য পাওনাটুকু দিতেও গড়িমসি করবেন, সেটা বন্ধুত্বের পরিচয় হতে পারে না। মুখে আপনারা যতই বাংলাদেশকে বন্ধু বলে বেড়ান, আচরণগতভাবে না পাল্টালে দুর্দিনে কাউকে পাশে পাবেন না। প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকা এটা একটি রাষ্ট্রের জন্য অনেক বড় দুর্বলতা। দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভাবনাময় ভারতের জন্য এখন সেই দুর্বলতাটুকু কাটিয়ে উঠাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এবার কি শুধরাবে!

Related posts

*

*

Top